দরিদ্রদের জন্য ভর্তুকি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে PDF Print E-mail
News

দরিদ্রদের জন্য ভর্তুকি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে

শুক্রবার, ২৫ মে ২০১২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯। দৈনিক ইত্তেফাক
বাজেট ভাবনায় ড. সাদিক আহমেদ

প্রতিবছর বাজেটে সরকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে থাকে। অনেক সময় এ ভর্তুকি অর্থায়ন

করতে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হয়, কাটছাঁট করতে হয় উন্নয়নমূলক খাতের ব্যয়। অথচ ভর্তুকি সুবিধার একটি অংশ ভোগ করেন ধনীরা। তাই ভর্তুকির সুবিধা যেন দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষরাই পায় তা নিশ্চিত করতে সরকারকে সুনির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ করতে হবে। পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান ড. সাদিক আহমদ। আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে ইত্তেফাক’কে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে এসব কথা বলেন।
সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ভবিষ্যত্ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করতে হলে বর্তমানকে মূল্যায়ন করে তার ভিত্তিতে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হয়। তাই আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে কিছু বলতে হলে প্রথমে চলতি অর্থবছরে অর্থনীতির সামগ্রিক দিক মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। চলতি অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো বড় অঙ্কের ভর্তুকি, সরকারের ব্যাংক ঋণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ কমে আসা।
এ বছর বিদ্যুত্ ও জ্বালানিখাতে উচ্চ ভর্তুকি দিতে গিয়ে সরকারের ভর্তুকি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বড় অঙ্কের এ ভর্তুকি অর্থায়নে সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংকিং সেক্টর থেকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ করতে হয়। সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ করায় বাধাগ্রস্ত হয় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ। ব্যাংক ঋণের উপর সরকারের নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো এ বছর যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ পাওয়ার প্রত্যাশা করা হয়েছিল তা পাওয়া যায়নি। বাজেটে বলা হয়েছিল এ বছর ১৮০ বিলিয়ন টাকা বিদেশি ঋণ আসবে। কিন্তু গত মার্চ পর্যন্ত নীট বিদেশি ঋণ নেতিবাচক। ফলে এ বছর ভর্তুকি অর্থায়ন করতে সরকারকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
প্রতিবছরই ভর্তুকি অর্থায়ন করতে সরকারকে অন্য খাতের ব্যয় সংকোচন করতে হয়। অথচ কষ্টসাধ্য এ ভর্তুকির একটি বড় অংশ ভোগ করেন ধনীরা। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ড. সাদিক বলেন, সরকার ভর্তুকির সিংহভাগ দিয়ে থাকে জ্বালানি তেল, সিএনজি ও বিদ্যুতে। ধনীরা তাদের গাড়িতে সিএনজি ব্যবহার করে এ ভর্তুকি ভোগ করে থাকেন। বিদ্যুত্ও দরিদ্রদের তুলনায় বেশি ব্যবহার করেন ধনীরা। তাই বিদ্যুত্, জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের ভর্তুকি কিভাবে গরিবদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় তা চিন্তা করার প্রয়োজন রয়েছে। উদাহরণসরূপ অন্য দেশে জ্বালানি তেলের ভর্তুকি না দিয়ে সাধারণ মানুষের যানবাহনের যে সব ব্যবস্থা রয়েছে (বাস, রেল, লঞ্চ) তাদের মধ্যে ভর্তুকি দেয়া হয় তেমনি বিদ্যুতের ভর্তুকিকে শুধুমাত্র স্বল্প ব্যবহার কারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
ড. সাদিক বলেন, চলতি অর্থবছরে দেশে মূল্যস্ফীতির হার দুই অঙ্কের ঘরে রয়েছে। অনেকে বলছেন, বাজেটে ভর্তুকি কমিয়ে দেয়া হলে পণ্য উত্পাদনে খরচ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। অথচ গত দুই বছর ধরে উচ্চ ভর্তুকি দেয়া সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতির হার কমেনি। বিশ্বের অনেক দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুত্ খাতে কোনো ভর্তুকি নেই, উপরন্তু ট্যাক্স আছে। তারপরও তাদের মূল্যস্ফীতির হার বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। তাই মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সব সময় ভর্তুকি দিতে হবে এ যুক্তি মেনে নেয়া যায় না। আগামীতে আমাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধি কমানোর লক্ষ্য নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
ড. সাদিক বলেন, ভর্তুকি অর্থায়নের জন্য সরকার রাজস্ব আয় বাড়ানোর উপর নজর দিতে পারে। দেশের জাতীয় আয়ের ৩৫ শতাংশ উপার্জন করে মাত্র ১০ ভাগ মানুষ। এদের উপর কর বাড়িয়ে জিডিপিতে আয়করের অবদান বাড়াতে হবে। বর্তমানে দেশের জিডিপিতে ব্যক্তিগত আয়করের অবদান মাত্র ১ শতাংশ। এ হার অন্তত ৩ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন।
চলতি অর্থবছরে দেশে সরকারি বিনিয়োগের প্রসার বাজেটের তুলনায় অনেক কম হয়েছে । গত অর্থবছরে সরকারি বিনিয়োগের হার কিছুটা উন্নতি হলেও এ বছর তা বাড়ার সম্ভাবনা নেই। এর মূল কারণ হলো অর্থ সঙ্কট। অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের জন্য বিদেশি অর্থায়ন না থাকায় মূলত ২০১১-১২ বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। বাস্তবায়ন দক্ষতা না থাকাটাও আর একটা কারণ। অর্থায়নের সঙ্কট দূর করতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবিসহ সব প্রতিষ্ঠান থেকেই বিদেশি অর্থায়ন আনতে তত্পরতা চালাতে হবে। আর দক্ষতা বাড়াতে প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
ড. সাদিক বলেন, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী দ্বিতীয় দফা অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরে রফতানি প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশ ধরা হলেও বছর শেষে তা ১০ শতাংশের মতো হতে পারে। বিশ্ব মন্দার প্রভাব বিবেচনায় বিদেশি ঋণ, বিদেশি বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর জন্য সরকারকে অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে হবে।

 
 
   
Copyright 2007-2010 Policy Research Institute
Website and Developed By IMEX