|
বিনিয়োগ-পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ উদ্বেগজনক: এমসিসিআই
নিজস্ব প্রতিবেদক | তারিখ: ১৪-০৬-২০১২। প্রথম আলো
নতুন অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাবিত ৭ দশমিক ২০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। তাঁরা বলছেন, এ জন্য যে বিনিয়োগের প্রয়োজন, সেটি পূরণ হওয়া নিয়ে যেমন শঙ্কা রয়েছে, তেমনি আছে মূল্যস্ফীতির চাপ।
গতকাল বুধবার দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের প্রভাবশালী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) আয়োজিত এক আলোচনায় এসব মতামত তুলে ধরা হয়।
২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর নিজেদের মতামত তুলে ধরতেই গতকাল দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলে এমসিসিআইয়ের সম্মেলনকক্ষে এমসিসিআই ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) যৌথভাবে এই আলোচনার আয়োজন করে।
আলোচনায় বলা হয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে যেন বিনিয়োগ কমে না যায়, সেদিকে সরকারকে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ, বিনিয়োগ কমে গেলে দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিদ্যমান করদাতাদের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে নতুন করদাতা সন্ধানের দিকে সরকারকে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে বাজেটবিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর ও এমসিসিআইয়ের ট্যারিফ ও ট্যাক্সবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান আনিস এ খান। অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন এমসিসিআইয়ের সহসভাপতি নিহাদ কবীর।
আমন্ত্রিত অতিথি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ১৯টি সূচকের মধ্যে একমাত্র প্রবাসী-আয় (রেমিট্যান্স) সূচকটি আমাদের আশা দেখাচ্ছে। এ ছাড়া কর আদায় সূচকটিও মোটামুটি ভালো। বাকি ১৭টি সূচকই খারাপ অবস্থায় রয়েছে।’
মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন, ‘বাজেটে বড় অঙ্কের ঘাটতি রয়েছে। দেশি-বিদেশি উৎস থেকে এই ঘাটতি মেটানো হবে। যদি কোনো কারণে বিদেশি অর্থ ও দেশের ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকার নির্ধারিত অর্থ না পায়, তাহলে ব্যাংকব্যবস্থার ওপর সরকারের অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে। অন্যথায় সরকারকে খরচ কমানোর পথে হাঁটতে হবে। ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ যেন বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা দরকার।’
মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন, ‘কর বাড়ানোর বিষয়ে সরকার যেসব সিদ্ধান্ত নেয়, সেগুলো প্রায়ই অস্থায়ী ভিত্তিতে হয়। আমি মনে করি, সবসময় কর হওয়া উচিত লাভের ওপর, লেনদেনের ওপর নয়।’ রপ্তানি পণ্যের ওপর উৎসে করহার বাড়ানোর ফলে রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মত দেন সাবেক এই অর্থ উপদেষ্টা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এ তসলিম বলেন, ‘বাজেটের বেশকিছু বিষয় পর্যালোচনা করে মনে হয়েছে, এটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ঋণের চুক্তির শর্ত পরিপালনমূলক বাজেট।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, ‘প্রতিবছরই দেখা যায় হিসাব মেলানোর বাজেট করতে গিয়ে এনবিআর করের বিভিন্ন জায়গায় নাটকীয় কিছু পরিবর্তন করে। প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি শুল্কের চেয়ে আধা শুল্কের (প্যারা ট্যারিফ) প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাজেটের হিসাব মেলাতে গিয়ে এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে।’
জায়েদী সাত্তার বলেন, ‘এক দশক ধরে যদি আমাদের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার ৭/৮ শতাংশ হয়, তাহলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে।’
আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণের যে লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে, সেটি মুদ্রাবাজারের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। যদি ঘাটতি পূরণের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা যায়, তাহলে বাজেটের মোট ঘাটতি বড় কোনো বিষয় নয়। তিনি আগামী অর্থবছরের মূল্যস্ফীতির প্রস্তাবিত হারকে উচ্চাভিলাষী বলে অভিহিত করেন।
আনিস এ খান বাজেটে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখায় এমসিসিআইয়ের হতাশার বিষয়টি তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকেও কঠিন বলে মত দেন।
আলোচনায় মোবাইল ফোনের বিলের ওপর উৎসে করারোপ এবং রপ্তানি খাতে উৎসে করের হার বাড়ানোর বিরোধিতা করেন ব্যবসায়ী নেতারা। সেই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক করহার কমানো ও চেম্বারগুলোকে করের আওতামুক্ত রাখারও সুপারিশ করেন তাঁরা।
|