Policy Research Institute - PRI Bangladesh

The Policy Research Institute of Bangladesh (PRI) is a private, nonprofit, nonpartisan research organization dedicated to promoting a greater understanding of the Bangladesh economy, its key policy challenges, domestically, and in a rapidly integrating global marketplace.

সাক্ষাৎকার_"উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন-প্রবৃদ্ধি-আয় বণ্টনের বৈষম্য নিয়ে ভাবতে হবে"-ড. বজলুল হক খন্দকার

View

News Published: Thursday, Jan 11, 2018

সম্পাদকীয়, সাক্ষাৎকার

উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন-প্রবৃদ্ধি-আয় বণ্টনের বৈষম্য নিয়ে ভাবতে হবে

২১:৪২:০০ মিনিটজানুয়ারি ১১, ২০১৮

ড. বজলুল হক খন্দকার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক। পিএইচডি করেছেন ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কাজের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য ও সামাজিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বৈষম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, স্ট্যাটিক ও ডায়নামিক ম্যাক্রো মডেল এবং মাইক্রো-সিমুলেশন মডেল ব্যবহার করে করনীতি (সামাজিক নিরাপত্তাসহ) সংস্কারের প্রভাব বিশ্লেষণ, ন্যাশনাল ট্রান্সফার অ্যাকাউন্ট (এনটিএ) মেথডোলজি ব্যবহার করে ইন্টারজেনারেশনাল ট্রেন্ড বিশ্লেষণ। দারিদ্র্য ও সামাজিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য, কর ও ব্যয়নীতি সংস্কারের অর্থনৈতিক ও কল্যাণমূলক প্রভাবসহ বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু নিয়ে তার বই ও নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে। সম্প্রতি তিনি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ, প্রবৃদ্ধির বণ্টন, দারিদ্র্য, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা প্রভৃতি নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

বাংলাদেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক অগ্রগতি সম্পর্কে মূল্যায়ন কী?

এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ৬ শতাংশের অধিক হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছে। সম্প্রতি সেটি ৭ শতাংশের ঘরে প্রবেশ করেছে। এটা একটা বড় অর্জন। এর মধ্যে বৈশ্বিক বেশকিছু শক হয়। ২০০৭-০৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ২০১৬ সালে ব্রেক্সিটের ফলে বেশকিছু ধনী দেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। এতসব সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতির পারফরম্যান্স ভালো ছিল। ধারাবাহিকভাবে ৬ শতাংশের ওপর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সহজসাধ্য বিষয় ছিল না। সে সময়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাংলাদেশ ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ফাঁদে পড়ে গেল কিনা। প্রতি দশকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ১ পার্সেন্টেজ পয়েন্ট করে। ’৯০ সালের দিকে ৩ থেকে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরে গেল। এরপর ৪ থেকে ৫ এবং ৫ থেকে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। এরপর অনেকদিন আমাদের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘরে উঠল। অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। অর্থনীতির পারফরম্যান্স হিসেবে যদি প্রবৃদ্ধিকে ইনডিকেটর (পরিমাপক) হিসেবে ধরা হয়, তবে এটি ভালো অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এর পেছনে যদি অন্যান্য বিষয় দেখি, তবে কিছুটা সংশয় থেকেই যায়। প্রবৃদ্ধির মূল নিয়ামক হচ্ছে বিনিয়োগ। বেসরকারি বিনিয়োগ এখনো আশানুরূপভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়নি। যে পরিমাণে সঞ্চয় হচ্ছে দেশে, সে পরিমাণে বেসরকারি বিনিয়োগ হচ্ছে না। অর্থনীতির অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে এটি একটি। বেসরকারি বিনিয়োগ না বাড়ার অন্যতম কারণ দুর্বল অবকাঠামো ও গ্যাস-বিদ্যুতের স্বল্পতা। বিনিয়োগের পর গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ কতদিনে পাবে, আদৌ পাবে কিনা ইত্যাদি বিষয়ে উদ্যোক্তাদের সংশয় রয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হচ্ছে, এসব সমস্যা মিটে যাবে। এ কথাগুলো আমরা দু-তিন বছর ধরে শুনছি। কিন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা ও জোগানের ব্যবধানটা এখনো ঘোচেনি। সহসা ঘাটতি পূরণের লক্ষণও স্পষ্ট নয়।

প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে চলমান বিতর্ক বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে পরিমাণ উল্লেখ করছে, তার সঙ্গে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দেয়া তথ্যে। এটি নিয়ে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা কেউ স্বস্তির মধ্যে নেই। অনেকেই অনেক প্রশ্ন করছেন, যেভাবে প্রবৃদ্ধির হার পরিমাপ করা হচ্ছে, সেটি কতটা সঠিক? প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে গভীর কোনো গবেষণা এখনো হয়নি। বিবিএস বলছে, প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাদের বিশ্লেষণ সঠিক। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রভৃতি আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থা প্রবৃদ্ধির সরকারি তথ্য নিয়ে অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে। এ অস্বস্তিকর অবস্থা দূর করার দায়িত্ব সরকারের। তারা নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে দেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করাতে পারে। পাশাপাশি এটি নির্ধারণের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতেও সংস্কার আনতে পারে। সরকার যদি বলে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট খাত থেকে আসছে, তাহলে বিতর্ক অনেকটাই তিরোহিত হবে। সরকার ঘোষিত প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বিতর্কের সুযোগ রয়েছে। যেহেতু বেসরকারি বিনিয়োগ ও বিনিয়োগ আশানুরূপ পরিমাণে বাড়ছে না, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে— প্রবৃদ্ধির উৎস কী? প্রবৃদ্ধি আসছে কোথা থেকে? তাহলে কি আমরা বলব, আমাদের দক্ষতা-সক্ষমতা-উৎপাদনশীলতা অনেক বেড়ে গেছে? কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান কমে গেছে, উৎপাদনশীলতা বাড়েনি বলেই খবর মিলছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। প্রবৃদ্ধির দুটো বড় নিয়ামক হলো, শ্রম ও মূলধন। মূলধন বাড়ছে না, শ্রমও কমে গেছে। তাহলে প্রবৃদ্ধির উৎস কী? আমাদের দক্ষতা বেড়ে গেছে? বিদ্যমান দুর্বল অবকাঠামোয় সেটি সম্ভব নয়। পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দরে যে সময় লাগছে প্রভৃতি আমলে নিলে দক্ষতা ও সক্ষমতা বেড়েছে বলে দাবি করা যাবে না।

প্রবৃদ্ধির বণ্টন নিয়ে কোনো প্রশ্ন রয়েছে কি?

সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বেই একটি বিষয় নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা চলছে। বলা হচ্ছে, শুধু প্রবৃদ্ধি দেখলেই হবে না, প্রবৃদ্ধির চরিত্র দেখতে হবে। প্রবৃদ্ধি অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে কিনা? প্রশ্ন হচ্ছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির কী ধরনের সংজ্ঞা আমরা ব্যবহার করছি? অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বলতে অনেকে কর্মসংস্থানকে বোঝান। আমরা দরিদ্র দেশ, জনসংখ্যা বেশি, কর্মসংস্থান আমাদের একটি বড় উদ্দেশ্য। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানও বাড়ছে কিনা অর্থাৎ কর্মসংস্থানের স্থিতিস্থাপকতা কেমন— এটি দেখতে হবে। আরো দেখতে হবে কোন খাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে— এটি কি আনুষ্ঠানিক খাতে হচ্ছে নাকি অনানুষ্ঠানিক খাতে? আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক কিন্তু নারী। অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও কর্মসংস্থান কতটা বাড়ছে। আরেকটি বিষয়, প্রবৃদ্ধির ভৌগোলিক বণ্টনটা কি হচ্ছে? এখন এ-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা হচ্ছে না। ১৯৯৬-২০০০ সালে বিবিএস একটি কাজ করেছিল, সেখানে ৬৪টি জেলার জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নির্ণয় করা হয়েছিল। পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, ঢাকার ম্যানুফ্যাকচারিং প্রবৃদ্ধি ছিল ৫৯ শতাংশ (১০০ শতাংশের মধ্যে) আর চট্টগ্রামের ছিল ২২ শতাংশ। দুটো জেলা মিলেই ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে। বাকি ২০ শতাংশ ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের প্রবৃদ্ধি এসেছে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে। বর্তমানে এ অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে বলে ধারণা। জিডিপিতে ঢাকার অবদান ছিল ৩৮ ও চট্টগ্রামের ২৫ শতাংশ। উত্তরাঞ্চলের ছিল ২০ ও দক্ষিণাঞ্চলের ১৭ শতাংশ। এ অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে কিনা, সেটি দেখতে হবে। তাহলে প্রবৃদ্ধির চরিত্র নিয়ে আরো বিশ্লেষণ করতে হবে। আমি বলব না, বণ্টন ত্রুটি ঠিক করতে গিয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করতে হবে। ওইসব অঞ্চলে প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে করণীয় ঠিক করতে হবে। সরকারের আরো কিছু কার্যক্রম নেয়া দরকার, যাতে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি ভালো হয়। এর প্রভাব কিছুটা হলেও এ বছরে দারিদ্র্য প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জে দারিদ্র্যের হার ২ শতাংশ, মুন্সীগঞ্জে ৩ শতাংশ। অথচ কুড়িগ্রামে ৭২ শতাংশ মানুষ দরিদ্র। দারিদ্র্যের হারে কত বড় ব্যবধান! আমাদের প্রবৃদ্ধি হওয়া দরকার সত্য। কিন্তু প্রবৃদ্ধি এখনো অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। এদিকে সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে।

দারিদ্র্য মানচিত্র সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কীসামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম কি এক্ষেত্রে কাজ করেনি?

সম্প্রতি প্রকাশিত দারিদ্র্য জরিপের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, রংপুরে দারিদ্র্য বেড়েছে। ২০১০ সালে রংপুরে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৬ সালে এটি দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশে। তার মানে গত পাঁচ বছরে রংপুরে দারিদ্র্য বেড়েছে। সব বিভাগে দারিদ্র্যের হার কমেছে, একমাত্র রংপুরেই বেড়েছে। মঙ্গাপীড়িত এলাকা বলে রংপুরে দারিদ্র্য বিমোচনে বেশি নজর দেয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান দেখলে মনে হয়, এসব সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম এখনো সঠিকভাবে কাজ করেনি। প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনে এটি নতুন ডিসকোর্স বটে। এ সম্পর্কে আমাদের পুরোপুরি ধারণা নেই। বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের গবেষণা প্রয়োজন। যদি এটি সত্য হয়, তাহলে কি আমরা বলব রংপুরে দারিদ্র্য আরো বাড়বে? যেখানে সারা দেশে দারিদ্র্য কমছে, সেখানে রংপুরে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি নতুন বার্তা দেয়। এটি অবশ্যই উদ্বেগজনক। প্রশ্ন হলো, এ জনগোষ্ঠীকে আমরা কী দিচ্ছি? সাম্প্রতিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণপূর্বক মনে হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। উত্তরাঞ্চলের দারিদ্র্য নিয়ে আমাদের ব্যাপক কাজ করা দরকার, বোঝা প্রয়োজন এর মর্মার্থ। দিনাজপুরে দারিদ্র্য বাড়ল কেন, তাও আমাদের বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তাহলে কি এত বছর ধরে নেয়া কার্যক্রমে উত্তরাঞ্চলে সুফল মেলেনি?

সরকারি  বেসরকারি কার্যক্রমগুলো সমস্যার তুলনায় কতটুকু?

সমস্যা যদি বড় হয় এবং এ প্রকল্পগুলোর আকার ছোট হয়, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। ৫০০ টাকার চাহিদা হলে ১০ টাকা জোগান দেয়া হলে সমাজে কোনো প্রভাব পড়বে না। রংপুরের দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রশ্ন উঠেছে। তার মানে কি রংপুর থেকে সম্পদ বাইরে চলে গেছে? এখানে যে কার্যক্রমগুলো ছিল, সেগুলো কি বন্ধ হয়ে গেছে? অথবা যে প্রক্রিয়ায় তারা আয় করত (যেমন ইন্টারনাল মাইগ্রেশন), সেটি কি বন্ধ হয়ে গেছে? কর্মসংস্থানের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, তৈরি পোশাক খাতে কর্মসংস্থান কমে গেছে। প্রশ্ন হলো, এর ভুক্তভোগী কি রংপুরের মতো দরিদ্র অঞ্চল? অনেক বিষয় এখানে চলে আসছে। এগুলো বিশ্লেষণ করে আমরা বলতে পারব দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়ার উত্তরটা কী। অনেক উত্তর হতে পারে। প্রকল্পগুলো আগে কার্যকর ছিল, এখন কি সেগুলো কার্যকর নেই? এমনও হতে পারে, এ সুবিধা যাদের পাওয়া উচিত তারা পাচ্ছে না। দুর্নীতিও বেড়ে যেতে পারে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে সংস্কার আনতে চাইছে। ২০১৫ সালে নতুন প্রকল্প হাতে নেয়ার কথা। ২০১০ সালে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি বিশ্লেষণ হয়েছিল, তখন আমরা দেখেছি, আমাদের এক্সক্লুশন সমস্যা বেড়ে গেছে। যে পরিমাণ অর্থ একজন ব্যক্তির দরকার, তার তুলনায় তিনি খুব কমই সহায়তা পাচ্ছেন। ২২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ বলেছিল, এ অর্থ আমার জন্য পর্যাপ্ত নয়। আমরা অর্থের পরিমাণ তেমন বাড়াতে পারিনি। বয়স্ক ভাতা ৩০০ টাকার জায়গায় ৫০০ টাকা করেছি। প্রকৃত অর্থে এটি আরো কম। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় পাঁচ বছরে এর প্রকৃত পরিমাণ (প্রকৃত অর্থে) আরো কমে গেছে। প্রকল্পের আওতায় নতুন আরো দরিদ্র মানুষ প্রবেশ করেছে বটে কিন্তু তাদের আমরা পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে পারিনি। আমরা জানি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বেড়েছে কিন্তু এর জিওগ্রাফিক লোকেশন কী?

আরো আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, আমাদের গড় দারিদ্র্য কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু ৩৬টি জেলার দারিদ্র্যের হার এর ওপরে। অর্ধেক জেলা খারাপ অবস্থায় রয়েছে। এক্ষেত্রে যে এলাকাগুলো পিছিয়ে আছে, সেগুলোর দিকে সরকারের বিশেষ নজর দিতে হবে। যেসব এলাকায় দারিদ্র্যের হার কমে এসেছে, সেগুলোর দিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে। নইলে যেকোনো সময় তাদের অবস্থাও খারাপ হয়ে যেতে পারে। দারিদ্র্যের নতুন কিছু পকেট তৈরি হচ্ছে। একসময় আমরা বলতাম প্রবৃদ্ধি-আয়-সুযোগ-সুবিধা প্রভৃতি বিবেচনায় বৈষম্য বিদ্যমান। ২০০৫ ও ২০১০ সালে বলা হচ্ছিল, অঞ্চলগুলোর মধ্যে উন্নয়নের বিভক্তি আর নেই। এখন আবার মনে হচ্ছে পূর্ব-পশ্চিম বিভক্তি বেড়ে উঠছে। রংপুর ও দিনাজপুরে দারিদ্র্যের হার এত বেশি দেখছি, তাতে এমন সংশয় তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বেসরকারি খাত স্বাভাবিকভাবেই এখানে বিনিয়োগ করবে না। এখন যেমন বলা হচ্ছে, পদ্মা সেতু হলে দক্ষিণে অনেক বেসরকারি কোম্পানি বিনিয়োগ করবে। এ মুহূর্তে সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের চিন্তা-ভাবনা করছে। সরকার যেসব স্থানকে এগুলো স্থাপনের জন্য বেছে নিয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই ঢাকা-চট্টগ্রাম-কুমিল্লাকেন্দ্রিক। এসব স্থান থেকেই আমাদের প্রবৃদ্ধি আসছে বেশি। অর্থনৈতিক অঞ্চলের কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি করছে, তারাও এসব স্থানেই কাজ করছে। সরকার যেসব অর্থনৈতিক অঞ্চল করতে চাইছে, সেগুলো পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে করা উচিত। শুধু তৈরি পোশাক শিল্প নয়, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপনের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল রংপুর বা বরিশালে করা যেতে পারে। এটি বেসরকারি খাতকে আকর্ষণ করতে পারে ধীরে ধীরে। সেক্ষেত্রে সরকারকে ব্যাপক ভর্তুকি, কর ছাড়, সুবিধা প্রদান প্রভৃতি দিতে হতে পারে। বেসরকারি খাতকে এ জায়গায় নিয়ে যেতে হবে প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে। 

কীভাবে  সমস্যার সমাধান মিলতে পারে?

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সিলেট থেকে মংলা পর্যন্ত করিডোর নির্মাণ করা হবে। যেখানে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ থাকবে। বাংলাদেশে পাইপলাইনের মাধ্যমে সস্তায় আর গ্যাসের জোগান দেয়া সম্ভব হবে না। এখন এলএনজি অর্থাৎ আমদানির মাধ্যমে জ্বালানি চাহিদা মেটাতে হবে। সেক্ষেত্রে মংলায় স্টেশন নির্মাণ করে সংশ্লিষ্ট এলাকার শিল্প-কারখানাকে আমদানিকৃত গ্যাস সরবরাহ করা যেতে পারে। এজন্য আমাদের বাড়তি বিনিয়োগ করতে হবে। রূপপুরে যদি পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র হয়, তাহলে এখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কি আমরা সেখানে ব্যবহার করব নাকি ঢাকা-চট্টগ্রামে নিয়ে আসব? ওখানে ব্যবহার করাই তো শ্রেয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক বিষয়টিকে আমাদের দুই দিক থেকেই দেখা উচিত। অর্থনীতির সাম্প্রতিক প্রবণতাকে আমরা যদি দিনের পর দিন অবহেলা করি, তবে এটি বড় ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন-প্রবৃদ্ধি-আয় বণ্টনের বৈষম্য নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবতে হবে।

সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের পরিবর্তন জরুরি?

বেসরকারি বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না, সেটি দ্রুত দেখা দরকার। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানে পদক্ষেপ নেয়াও প্রয়োজন। সরকার যতই বলুক বিডা করছি, ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করেছি, তথ্যে তার তেমন প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি। ২০১৬ সালে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ২২ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ২০১৭ সালে এটি দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশে। এক বছরে মাত্র পয়েন্ট শূন্য ২ শতাংশ বেড়েছে। এত কম বেসরকারি বিনিয়োগ আমাদের জন্য কাম্য নয়। আমাদের পরিকল্পনায় কিন্তু অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো আমাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। নইলে কর্মসংস্থান বাড়ানো যাবে না। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করার একটি বড় উদ্দেশ্য হলো, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো। এক্ষেত্রে কোনো প্রভাব না পড়লে কেন এগুলো করা হচ্ছে? সরকারি বিনিয়োগে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের দিকে বাড়তি দৃষ্টি দেয়া দরকার। পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্দেশ্য হলো, সরকার কানেক্টিভিটি বাড়াচ্ছে। সরকার যমুনা সেতু করেছে। কিন্তু শুধু কানেক্টিভিটি দিয়ে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়ানো যায় না। কিছু মানুষ ঢাকায় এসেছে বটে, কর্মসংস্থান হয়েছে কিন্তু দারিদ্র্য বা আয় পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। তার মানে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আরো কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি ও বিদ্যুতের জোগান বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আর্থিক কিছু সুবিধা জোগানো যেতে পারে। যেমন— স্বল্প সুদে ঋণ, কর মওকুফ সুবিধা, ভর্তুকি। এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হলে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোর জন্য একটি তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছিল। তার কতটা অগ্রগতি হয়েছে, সে সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য মেলে না। এ তহবিল গঠিত হলে তা উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের জীবন-জীবিকা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা উচিত। আমাদের টেকসই উন্নয়নের দিকে আস্তে আস্তে যেতে হবে। সরকার প্রথমবারের মতো বদ্বীপ পরিকল্পনা করেছে। দ্রুতই এটি বাস্তবায়ন করা উচিত। আমরা ডেল্টা কমিশন করব কিনা বা এটি গঠন কতটা যৌক্তিক হবে প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আরো কাজের সুযোগ রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে এটি কতটা সম্পূরকভাবে কাজ করবে তা নির্ধারণ করতে হবে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এসব বিষয় অবশ্যই আসা উচিত। গতানুগতিক ধারায় সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার যুগের অবসান হয়েছে। এখন প্রয়োজন নব উদ্যমে যুগোপযোগী পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো।

পোশাকনির্ভর রফতানি খাত টেকসই অর্থনীতি কতটা নিশ্চিত করে?

আমরা বহুদিন ধরে রফতানি পণ্য ও সংশ্লিষ্ট বাজার বহুমুখীকরণের কথা বলে আসছি। তৈরি পোশাক শিল্প গড়তে সরকার যেসব সুযোগ-সুবিধা জুগিয়েছিল, সেগুলো অন্যান্য খাত পায়নি। ফলে অন্যান্য শিল্প খাত তেমনভাবে এগোতে পারেনি। রফতানি নীতির সঙ্গে রাজস্ব নীতির সমন্বয় করা প্রয়োজন। আমরা এখনো বলি, আমাদের করহার অনেক খাতের জন্য এখনো অনেক বেশি। সরকার কাস্টমস কর কমিয়েছে কিন্তু সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছে। সেখানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে, আমাকে কর আহরণ করতে হবে। রফতানির পক্ষের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ শুল্কারোপ করে রফতানি খাতকে প্রণোদনা জোগানো যাবে না। আমরা বলব, রফতানিকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণও বাড়াতে হবে। রফতানির পরিমাণ বাড়লে স্বল্প রাজস্ব হারেও অধিক কর আহরণ সম্ভব। রাজস্ব খাতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারগুলো আমরা করতে পারিনি। নতুন ভ্যাট আইনটি এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি। বছরের পর বছর এটিকে ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। আয়করের সংস্কারগুলো এখনো অনেক শ্লথ। দুটো জায়গা থেকে আশানুরূপ রাজস্ব আসছে না বলে এনবিআর আমদানির ওপর শুল্কারোপ করছে। এখান থেকে রাজস্ব আদায় করা অনেক সহজ। কিন্তু আয়কর ও ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায় করা একটু কঠিন। রাজস্ব আয়ের বিভিন্ন খাতের মধ্যে ভারসাম্য আনা জরুরি। সরকার চামড়া শিল্পকে বলছে, ‘থ্রাস্ট সেক্টর’। চামড়াজাত পণ্যের বড় বাজার স্থানীয় পর্যায়ে থাকায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো রফতানিতে আগ্রহ বোধ করে না। তারা যদি দেখে কম পরিশ্রমে ভালো মূল্যে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করা যায়, তাহলে তারা কেন আন্তর্জাতিক বাজার ও প্রতিযোগিতা নিয়ে চিন্তা করবে। প্রতিটি পণ্যের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। তৈরি পোশাক খাত যদি দেখে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করে আন্তর্জাতিক মুনাফা অর্জন করতে পারছে, তাহলে কেন সে অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের পেছনে ঘুরবে, কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়ন করবে। এখানে সেই বাজার নেই বলেই তারা আন্তর্জাতিক বাজারে যাচ্ছে। অনেকে অবশ্য প্রশ্ন করেন, এসব না করেই আমি ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি, তাহলে আমি কেন চিন্তা করব? এত কিছুর পরও আমরা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়ে গেছি, আমাদের দরিদ্র কমে গেছে। এগুলো অর্জিত হয়েছে বলেই আমাদের তাড়না আসছে না। এখানে আমাদের টার্গেট ও স্ট্র্যাটেজি ডিলেমা রয়ে গেছে। রফতানি বাড়াতে যেসব প্রণোদনা দেয়া দরকার তা সরকারের জোগানো উচিত। আমাদের মুদ্রাবিনিময় হারটা আরো একবার মূল্যায়ন হওয়া উচিত। ধীরে ধীরে টাকার মান সমন্বয় (অ্যাডজাস্ট) করা উচিত। হঠাৎ করে মুদ্রার মান কমে গেলে মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এখন খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কম আছে জ্বালানি তেলের দাম কমার জন্য। এ পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা যায় কিনা, তা বিবেচনায় নিতে পারে সরকার। এতে বেসরকারি খাত বাড়তি প্রণোদনা পাবে। রফতানিকারকদের অনেকেই বলেন, আমাদের এক্সচেঞ্জ রেট অতিমূল্যায়িত। ভারত ও চীন রফতানি বাড়াতে এক্সচেঞ্জ রেট কমিয়েছে আর আমরা আমদানির কথা বলে একে জোরপূর্বক ধরে রেখেছি। এতে রফতানিকারকরা কিছুটা সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছে। সরকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এক্সচেঞ্জ রেট পুনর্নির্ধারণ করতে পারে। আগামী বছর রফতানিকারকরা মজুরি বৃদ্ধির একটি চাপ অনুভব করবে। দেখার বিষয়, রফতানিকারকরা পণ্য উৎপাদনে এটিকে কীভাবে সমন্বয় করে। সেখানে রফতানি নীতি, এক্সচেঞ্জ রেট পলিসিগুলো আরো একবার দেখা দরকার। (বাকি অংশ আগামীকাল)

http://bonikbarta.net/bangla/news/2018-01-11/144358/%E0%A6%89%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%B0-%E0%A6%93-%E0%A6%A6%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BF%E0%A6%A3%E0%A6%BE%E0%A6%9E%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%89%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A7%9F%E0%A6%A8-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A7%83%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%BF-%E0%A6%86%E0%A7%9F-%E0%A6%AC%E0%A6%A3%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A7%88%E0%A6%B7%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87/

 

Speech