Policy Research Institute - PRI Bangladesh

The Policy Research Institute of Bangladesh (PRI) is a private, nonprofit, nonpartisan research organization dedicated to promoting a greater understanding of the Bangladesh economy, its key policy challenges, domestically, and in a rapidly integrating global marketplace.

আয় বুঝিয়া ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা

News Published: Tuesday, Dec 27, 2011

আয় বুঝিয়া ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা

মঙ্গল, ২৭ ডিসেম্বর ২০১১, ১৩ পৌষ ১৪১৮। ইত্তেফাক

দেশে বিরাজমান অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটাইয়া উঠিবার জন্য আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কোনো বিকল্প নাই বলিয়া মনে করেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই। সম্প্রতি পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)-এর নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান মনসুর ইত্তেফাকের ‘অর্থনীতি’ পাতায় প্রকাশিত নিবন্ধে অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি আয় বুঝিয়া ব্যয় করা ও চাহিদাজনিত চাপ কমাইবার পরামর্শ দিয়াছেন। বিদ্যমান বাস্তবতায় এই অভিমতের তাত্পর্য অনুপেক্ষণীয়। গত বত্সর আমাদের দেশে আসে প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার। আমাদের ইহার মধ্যেই খরচ সীমাবদ্ধ করিবার কথা। নতুবা আমাদের নির্ভর করিতে হইবে বিদেশী ঋণের উপর, যাহা সর্বদা সুলভ ও ঝুঁকিমুক্ত নহে। এমতাবস্থায় ইংরেজি ভাষায় বহুল প্রচলিত কাট ইউর কোর্ট একর্ডিং টু ইউর ক্লথ অর্থাত্ আয় বুঝিয়া ব্যয় করো—এই প্রবাদবাক্যটি স্মরণ করা বাঞ্ছনীয়। এই আপ্তবাক্য ব্যক্তিগত জীবনে যেমন, তেমনই পারিবারিক ও সামাজিক জীবনেও সত্য। জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও আয়-ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা অপরিহার্য। কিন্তু প্রায়শ বাস্তব ক্ষেত্রে আমরা এই নীতি মানি না বা মানিয়া চলিতে পারি না। ফলে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা কঠিন হইয়া পড়ে। দেখা দেয় নুন আনিতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। ব্যক্তিগত পর্যায়ে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতার পরিণাম সম্পর্কে সচেতনতার অভাব অনেকের মধ্যে দেখা না গেলেও সামষ্টিক জীবনে ইহার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আমরা ঔদাসীন্য প্রদর্শন করিয়া থাকি, যাহা খুবই দুঃখজনক।

আমাদের চলতি জাতীয় বাজেটের দিকে লক্ষ্য করিলে দেখা যায় ঘাটতির অংক মোটেও কম নয়। যেখানে সীমিত সামর্থ্যের কারণে মানিটারি ও ফিসকাল পলিসিতে সংকোচন নীতি অনুসৃত হওয়ার কথা, সেখানে গ্রহণ করা হইয়াছে ব্যয়বহুল নীতি। ইহা সামষ্টিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করিয়া তুলিতে পারে, বলিয়া বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করিয়া থাকেন। অর্থবর্ষের শুরুতেই সার্বিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি যেরূপ দেখা যাইতেছে, তাহাতে উপরোক্ত ধারণাকে অমূলক বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া যায় না। মূল্যস্ফীতি বাড়িয়া যাওয়ার কারণে ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হইয়াছে হতাশাজনক পরিস্থিতি। মূল্যস্ফীতি দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য বিড়ম্বনাকর। আখেরে ইহা সরকারের জন্যও খারাপ ফল বহিয়া আনিবে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের ভারসাম্য নষ্ট হইবে। অথচ আয় বুঝিয়া ব্যয়ের নীতি অনুসৃত হইলে এবং এই ব্যাপারে জনগণের মধ্যে যথাসময়ে সচেতনতা সৃষ্টি করিতে পারিলে অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমিয়া আসে। প্রকৃতপক্ষে ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপরিণামদর্শিতা শেষপর্যন্ত ডাকিয়া আনে বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয়।

আয়ের চাইতে ব্যয় বাড়িলে ঋণনির্ভরতা বাড়ে ইহা জানা কথা। আর ঋণ কোনভাবেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতার সহায়ক নয়। সনাতন ধর্মের শাস্ত্রে ঋণী ও প্রবাস জীবন যাপনকারী ব্যক্তিদের অসুখী বলা হইয়াছে। ইসলাম ধর্মে ঋণগ্রস্ত মানুষকে যন্ত্রণা হইতে বাঁচাইতে যাকাত দানের কথাও বলা হইয়াছে। এইভাবে দেখা যায় ঋণ যে কোনভাবেই হউক, তাহা অসুখের নামান্তর। বিশেষত উত্পাদনের সঙ্গে সম্পর্কহীন ঋণ সর্বদাই পরিত্যজ্য। অথচ আয়ের মধ্যে খরচ সীমাবদ্ধ রাখিতে পারিলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় না। কিন্তু বর্তমানে চাণক্যবাদী অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই সর্বব্যাপী বিস্তার লাভ করিয়াছে। ফলে অর্থনীতিতে সুস্থিরতা আনায়ন করা কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। চাণক্য প্রয়োজনে ঋণ করিয়া হইলেও ঘি খাওয়ার কথা বলিয়া গিয়াছেন। কিন্তু বাস্তবে ঋণ করিয়া ঘি খাইলে, পরিণামে দারিদ্র্য আসিয়া কাড়িয়া নেয় সর্বসুখ। সুতরাং সামষ্টিক কল্যাণ ও অগ্রগতি চাহিলে রাষ্ট্রীয় জীবনেও আয় মোতাবেক ব্যয় করার রীতি গড়িয়া তুলিতে হইবে। জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াইবার জন্য সেবা ও পণ্যের উত্পাদন বাড়াইয়া কিভাবে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ  সৃষ্টি করা যায়, সেই পন্থা খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। বিনিয়োগ ও ইনকাম জেনারেটিং প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের দিকে গুরুত্ব দেওয়া বাঞ্ছনীয়। ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি দেশেরও আয় কিভাবে বাড়িতে পারে, সেইদিকে মনোনিবেশ করা দরকার। তাহা হইলেই কেবল অর্থনীতির মজবুত ভিত রচনা করা সম্ভবপর হইতে পারে।

 

Speech