Policy Research Institute - PRI Bangladesh

The Policy Research Institute of Bangladesh (PRI) is a private, nonprofit, nonpartisan research organization dedicated to promoting a greater understanding of the Bangladesh economy, its key policy challenges, domestically, and in a rapidly integrating global marketplace.

শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধির ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে পাবে

News Published: Monday, Feb 28, 2011

 

শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধির ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে পাবে

 

­­­­­. আহসান মুনসুর, নির্বাহী পরিচালক, পিআরআই 


বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান মুনসুর মনে করেন যদি শেয়ারবাজার প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়া যায় তবে

বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। এমন পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ ধারণা জন্ম নেয় যে বাজারে এ ধরনের বাবলও আর হবে না বা এ ধরনের দরপতন হবে না কেবল তখনই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা প্রবেশ করবে। ইত্তেফাকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শেয়ারবাজারের সামপ্রতিক উত্থান পতন ও এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। নিচে সেটি তুলে ধরা হয়।

 

Ahsan_H._Mansur
সমপ্রতি শেয়ারবাজারে উত্থান পতনের কারণ 


সামপ্রতিক সময়ে শেয়ারবাজার যেভাবে ফুলে ফেঁপে উঠেছিল তার কারণ মূলত ৫টি। তারল্যের অতিরিক্ত প্রবাহ, ছোট ছোট বিনিয়োগকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি, শেয়ারের স্বল্পতা, শেয়ারবাজারে ব্যাংকের অত্যধিক বিনিয়োগ এবং কতর্ৃপক্ষের ঘন ঘন সিদ্ধান- পরিবর্তন।


তারল্যের অতিরিক্ততার ক্ষেত্রে দেখা যায়, গত অর্থবছরে দেশে ২০ ভাগেরও বেশি অর্থের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি এ বছর অর্থের সরবরাহ বাড়ানোর কারণে দেশে আর্থিক তারল্য বৃদ্ধি পায়। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই যখন মানুষের কাছে অর্থের জোগান বেশি থাকবে মানুষ ভোগ ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ ব্যয়ও বাড়িয়ে দেবে। ফলে শেয়ারবাজারে তারল্য অনেক বেড়ে যায়। বন্যার পানি যেমন ছোটখাটো বাঁধ দিয়ে আটকানো যায় না। ঠিক একইভাবে দেশের অতিরিক্ত অর্থের জোয়ার শেয়ারবাজারে চলে আসে। তাছাড়া শেয়ারবাজারে স্বল্প সময়ে অধিক লাভের আশায় মানুষ এদিকে ঝুঁকে পড়ে। বাজারে অর্থের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে শেয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি না পাওয়ায় বাজারে শেয়ারের দাম অনেক গুণ বেড়ে যায়। তাছাড়া ২০০৯ সালের বাজেটে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার জন্য অনুমতি দেয়ায় বাজারে তারল্য আরো বেড়ে যায়।


২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশে মোট বিও একাউন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ লাখ ২১ হাজার। অথচ মাত্র তিন বছর আগে এর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ লাখ। তাছাড়া জেলা পর্যায়ে ব্রোকারেজ হাউজ খোলার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ৩২টি জেলায় ২৩৮টি ব্রোকারেজ হাইজের ৫৯০টি শাখা খোলা হয়েছে এ সময়ে। শেয়ার মেলার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ করা হয়েছে বিনিয়োগের জন্য। ফলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।


এদিকে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও বাজারে শেয়ারের জোগান সে হারে বাড়েনি। বাংলাদেশের ৮০ ভাগ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান শেযারবাজারে অন্তভর্ুক্ত হয়নি। যারা শেয়ারবাজারে আছে তাদেরও শেয়ারের সংখ্যা কম। সুতরাং চাহিদা জোগানের নিয়ম অনুযায়ী ভারসাম্য করতে শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে অতিরিক্ত মাত্রায়। ২০১০ সালে মাত্র ৬টি কোম্পানি বাজারে আইপিও'র মাধ্যমে শেয়ার ছেড়েছে। আর ২টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি অন-ভর্ুক্ত হয়েছে শেয়ারবাজারে। ২০০৯ সালেও শেয়ার ছাড়ার পরিমাণ ছিল খুবই কম। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে ছাড়ার কথা থাকলেও তা আসেনি।


২০০৬ সালের তুলনায় ২০০৯ সালে ব্যাংকগুলোর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৮ গুণ। ২০১০ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পায়। ২০০৯ সালে শেয়ারবাজার থেকে প্রায় সাড়ে ১১ বিলিয়ন টাকা মুনাফা অর্জন করেছে।


এ সময়ে দেখা যায়, শেয়ারবাজার কতর্ৃপক্ষ ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন করে। এসইসি বাজারে একটি নীতি আরোপ করল ফলে বাজার দারুণভাবে প্রভাবিত হলো। আবার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে নীতি পরিবর্তন করে ভিন্ন নীতি গ্রহণ করা হচ্ছে। কখনো কখনো ঠিক উল্টো নীতিও নেয়া হচ্ছে। এর একটা উদাহরণ হলো এসইসি একবার মার্জিন লোন দেয়ার ক্ষেত্রে একটি হার নির্ধারণ করে। কয়েকদিন পর আবার সে হার পরিবর্তন করে। একবার সিদ্ধান- নেয় মার্জিন লোন দেয়া হবে। আবার তা বন্ধ করে দেয়া হয়। এদিকে এ ধরনের প্রত্যেকটি সিদ্ধান-ের কারণে বাজার প্রভাবিত হয়েছে।


বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী করা যায়?


বর্তমানে শেয়ারবাজার আবার ধীরে ধীরে কারেকশনের দিকে যাচ্ছে। তবে সরকারের জন্য বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন যতক্ষণ পর্যন- না শেয়ারের দাম কোম্পানির মৌল ও ভবিষ্যতের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত না হয়। তাছাড়া বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর মাধ্যমে বাজারের দাম পুনরায় যেন না পড়ে বা সূচক স্থিতিশীল হয় এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না। যেহেতু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের মাধ্যমে অনেক বিনিয়োগ হয়ে থাকে ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এটি অনেক উপযোগী সিদ্ধান- হবে। তবে শুধু বাজারে কারেকশন হলেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে না। আরও কিছু কাজ করতে হবে। এমন পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ ধারণা জন্ম নেয় যে বাজারে এ ধরনের বাবলও হবে না বা এ ধরনের দরপতন হবে না কেবল তখনই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা প্রবেশ করবে। তাছাড়া বাজারের কেলেঙ্কারির কারণ খুঁজতে ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন- কমিটির রিপোর্টও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এসইসি'র নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। তাছাড়া এসইসি যদি দক্ষ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়ে কাজ করতে পারে। বাজারে এসইসির পর্যবেক্ষণ বাড়ানো যেতে পারে।


সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার আসলে বাজার স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?


বাজারে নতুন সরকারি শেয়ার ছাড়ার মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল করার যে পরিকল্পনা তা অনেকটা দেরিতে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া সরকার যদি সেপ্টেম্বরের মধ্যে সরকারি শেয়ার বাজারে ছাড়ে তবে দেশে ভালো শেয়ারের পরিমাণ বৃদ্ধিতে বাজারে সূচক আরো পড়ে যেতে পারে কারণ এর মাধ্যমে বাজারে আরো তারল্যের প্রয়োজন হবে। যা বাজারে এখন বড় সমস্যা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতায় এ পরিস্থিতিতে বরং বাজারে শেয়ারের পরিমাণ যেন না বাড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অন্যদিকে যখন বাবল চলছিল তখন নতুন শেয়ার বাজারে ছাড়ার প্রয়োজন ছিল। এ অবস্থায় নতুন করে শেয়ার আসলে বাজারে সূচক আরো পড়ে যাবে। যা গত ১৩ ফেব্রুয়ারিতে দেখা যায়। যখন সরকার নতুন শেয়ার ছাড়ার ঘোষণা দেয় তখন বাজারে সূচক আরো পড়ে যায়। বাজারে এমনিতেই শেয়ারের চাহিদার অভাব রয়েছে। এ অবস্থায় বাজারে এ ধরনের সরকারি শেয়ারবাজারে সূচক বৃদ্ধি না করে বরং বাজার আরো খারাপ করে দেবে।


বাজার যেসব অনিয়ম হয়েছে বা সংঘবদ্ধ চক্রের টাকা তুলে নেয়ার কথা বলা হয়েছে এসব ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?


এক্ষেত্রে আমাদের বাজার থেকে মুনাফা অর্জনের পদ্ধতি সম্পর্কে বুঝতে হবে। কোনটিকে বৈধ আর কোনটিকে অবৈধ বলা হবে এ ব্যাপারে জানতে হবে। শেয়ারবাজারে সব বিনিয়োগকারীই আসে মুনাফা করার জন্যই। কেউই এখানে চ্যারিটির জন্য আসে না। সুতরাং মুনাফা করাটা অবৈধ কোনো কাজ নয়। তাছাড়া স্বল্পমূল্যে শেয়ার ক্রয় করে বেশি মূল্যে শেয়ার বিক্রি করাই বরং শেয়ারবাজারে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ও বুদ্ধিমানের কাজ। সুতরাং কোনো বিনিয়োগকারী যদি ডিসেম্বর মাসে যখন সূচক অনেক বেশি ছিল তখন তার সব শেয়ার বিক্রি করে থাকে তাকে অবৈধ বা সিন্ডকেট বলে দোষ দেয়া যাবে না। আবার অনেক শিক্ষিত বিনিয়োগকারীই ডিসেম্বরে তাদের হিসাব বন্ধ করে দেয়ার জন্য শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে। তাদেরও কোনোভাবেই দোষ দেয়া যাবে না। তবে এ সময়ে অনেকেই ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবৈধ কাজ করে থাকে। এক্ষেত্রে এইসইসির দায়িত্ব হলো এসব অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এসইসির পাশাপাশি মিডিয়াও এ ব্যাপারে কাজ করতে পারে।

তদন- কমিটি যদি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারে বা সরকার যদি প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় তাহলে কী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসতে পারে?


সাধারণ বিনিয়োগকরাীরা আশা করছে যে বাজারের সামপ্রতিক ঘটনায় কমিটি একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। তবে তদন-ের বিষয় ও আওতা অনেকটা বিস-ৃত। তাই কমিটির জন্য প্রতিবেদন প্রস্তুত করা অনেকটাই কঠিন কাজ। আমি আশা করছি, কমিটি সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলেই প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। তাছাড়া কমিটি শুধু বাজারের ঘটে যাওয়া ঘটনার কথাই বলবে না বরং শেয়ারবাজারের ভবিষ্যতের কথা নিয়েও বলবে। অর্থাৎ আমি বুঝাতে চাচ্ছি বাজারের সামপ্রতিক যে কেলেঙ্কারি কমিটি শুধু তার কারণই বের করবে না বরং বাজারের উন্নয়নে কিছুৃ পরামর্শও দেবে। যা বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে পুনরায় এ ধরনের বাবল বা কেলেঙ্কারি থেকে রক্ষা করবে। তাছাড়া বাজারে বিশেষ কিছু পরামর্শ দিতে পারে যা বাজারকে ভালো পথে হাঁটতে সাহায্য করবে। তাছাড়া তদন- কমিটির দেয়া পরামর্শ অনুযায়ী বাজার যদি পরিচালনা করা হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়া হয় তবে শেয়ারবাজার বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

Speech