Policy Research Institute - PRI Bangladesh

The Policy Research Institute of Bangladesh (PRI) is a private, nonprofit, nonpartisan research organization dedicated to promoting a greater understanding of the Bangladesh economy, its key policy challenges, domestically, and in a rapidly integrating global marketplace.

বিশ্ব অর্থনীতি এক ধরনের টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে

View

Published: Tuesday, Nov 29, 2016

logo

প্রকাশ: ১২:০০:০০ AM, মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৯, ২০১৬

 
   

ড. আহসান এইচ মনসুর, নির্বাহী পরিচালক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ঢাকা

বিশ্ব অর্থনীতি এক ধরনের টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে

সাক্ষাৎকারে ড. আহসান এইচ মনসুর

এম এ খালেক

http://www.alokitobangladesh.com/uploads/todaynews/2016/11/29/mansoor.jpg

আলোকিত বাংলাদেশ : ব্রিটেন সম্প্রতি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

ড. আহসান এইচ মনসুর : বিশ্ব অর্থনীতি এক ধরনের টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন কারণেই বিশ্ব অর্থনীতিতে হাই লেভেল অব টেনশন আছে। এ টেনশন সৃষ্টি হয়েছে কিছুটা জিও পলিটিক্যাল কারণে। আর কিছুটা অর্থনৈতিক কারণে। সেই সঙ্গে চীনের অর্থনীতির শ্লথ গতিও একটি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কিন্তু এখনও ঋণ সঙ্কট থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্রেক্সিট একটি বড় ধরনের ‘শক’ বা দুর্ঘটনা বলা যেতে পারে। অধিকাংশ মানুষই মনে করেছিল যে, ব্রিটিশরা ইউারোপিয়ান ইউনিয়নে থাকার পক্ষেই মত দেবে। যে কারণে এটা নিয়ে করপোরেট সেক্টরে, সরকারি পর্যায়ে এমনকি ব্রিটিশ সরকারের মধ্যেও খুব বড় রকমের পরিকল্পনা ছিল না। কাজেই এটাকে বিস্ময়কর এবং একই সঙ্গে একটি শকিং ঘটনা হিসেবে নিয়েছে সবাই। যে কারণে বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে কী প্রক্রিয়ায় ব্রিটেন বেরিয়ে যাবে সেটাও অজানা। কারণ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন গঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো দেশ আর্টিকেল-৫৫ এর আওতায় বেরিয়ে যায়নি। কাজেই কী প্রক্রিয়ায় ব্রিটেন বেরিয়ে যাবে তা কেউ জানে না। পুরো প্রক্রিয়াটি এখনও অনিশ্চিত। ব্রিটেনের এই বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি কীভাবে ঘটবে তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। তাদের যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রিটেনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল তা কি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হবে, নাকি তা রেখেই এই বিচ্ছেদ হবে? এ বিষয়গুলো এখনও নিশ্চিত নয়। কাজেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে যাওয়ার পরই বিষয়গুলো জানা যাবে। আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থায় কোনো সময়ই অনিশ্চয়তা সমাদৃত হয়নি। অর্থনীতিতে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। ব্রিটেনের এই ব্রেক্সিটের ভোটের মাধ্যমে বিরাট রকমের এক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যেতে কত দিন লাগবে তা নিয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। যদিও বলা হয়েছে যে, ২ বছরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই মনে করেন, এটা ২ বছরে সম্ভব হবে না। এখনও পর্যন্ত আবেদন করা হয়নি। আগামী জানুয়ারি মাসে হয়তো আবেদন করা হবে। তখন থেকে দুই বছরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু সবাই মনে করছেন, আবেদন করার পর ২ বছরের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। দ্বিতীয়ত, এ অনিশ্চয়তার ফলাফল কী হবে? ব্রিটেন এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বিনিয়োগের ওপর মন্দ প্রভাব পড়বে। যতদিন এ অনিশ্চয়তা চলতে থাকবে ততদিনই মন্দাভাব বিরাজ করবে। ব্রিটেন এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন উভয়ের জন্যই এ মন্দাটা মধ্য মেয়াদি মন্দায় পরিণত হবে। উল্লেখ্য, বিনিয়োগই হচ্ছে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। কাজেই বিনিয়োগের ওপর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার অর্থই হচ্ছে পুরো অর্থনীতি প্রভাবিত হওয়া। বিনিয়োগ বেশি হলে শেয়ার মার্কেট এমনিতেই চাঙ্গা হয়ে উঠবে। আর এটা ঠিক যে, শেয়ার মার্কেট এরই মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ব্রিটেন আবার বিদেশি বিনিয়োগের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ব্রিটেনে প্রচুর বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে। রাশিয়া, জাপান, চীন, ভারত ইত্যাদি দেশ থেকে প্রচুর বিনিয়োগ যায় ব্রিটেনে। ঐতিহাসিকভাবেই ব্রিটেনে বিদেশি বিনিয়োগ হয়ে থাকে। সে বিনিয়োগ এখন তারা ধরে রাখতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আগামীতে আরও বিনিয়োগ তারা আকর্ষণ করতে পারবে কিনা। যে কারণে রিয়েল এস্টেট খাতে ধস নেমেছে। বাইরে থেকে অনেকেই ইংল্যান্ডে হাউজিং খাতে বিনিয়োগ করে থাকেন। হাউজিং ইনভেস্টমেন্টের জন্য ইংল্যান্ড অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্য। অবশ্য হাউজিং সেক্টরের বাইরেও ব্রিটেনে অনেক ধরনের বিনিয়োগ হয়ে থাকে। আগামীতে এ বিনিয়োগগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পতিত হতে পারে। এ বিনিয়োগ সমস্যা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জন্যও প্রযোজ্য। কথা উঠেছে, ব্রেক্সিটই কি শেষ নাকি ব্রেক্সিটই শুরু। যদি সত্যি আরও কোনো কোনো দেশ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে সেটা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

 ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ব্রিটেনের সঙ্গে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক কেমন হবে বলে মনে করেন?

  এটা এখনও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। একমাত্র ভবিষ্যৎই বলতে পারবে এ সম্পর্ক কেমন হবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটা কেমন হবে তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে। উভয় পক্ষেই এজন্য শক্তিশালী টিম গঠন করা হচ্ছে। তারা টেকনিক্যাল লেভেলে নেগোসিয়েশন করবে। পলিটিক্যাল লেভেলে তিনটি দেশই মূলত ভূমিকা পালন করবে। এরা হচ্ছে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালি। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের পক্ষে দেশটির নতুন সরকার নেগোসিয়েশন করবে। এ নেগোসিয়েশন কীভাবে হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এ নেগোসিয়েশন অনেকটাই নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। এখানে অর্থনৈতিক ইস্যুর বাইরেও অন্যান্য ইস্যু নিয়ে চিন্তা করতে হবে।

 ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেছেন, ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন বেশ কিছু জটিল সমস্যায় পতিত হতে যাচ্ছে। এ সমস্যা কোন কোন ক্ষেত্রে হতে পারে বলে মনে করেন?

   এ সমস্যাগুলো বহুমুখী। প্রধান সমস্যা হবে অভিবাসীদের নিয়ে। ইউরোপীয় অনেক অধিবাসী ব্রিটেনে চাকরি করত। এদের সংখ্যা প্রায় ২ মিলিয়নের মতো। এ বিপুলসংখ্যক মানুষ শুধু যে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে তা নয়, তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দেবে। এ অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে কেউ কিছু বলছে না। ব্রিটিশ সরকার বলছে না যে, তাদের বের করে দেয়া হবে। আবার এটাও বলছে না যে, তাদের ব্রিটেনে থাকতে দেয়া হবে। ব্রিটিশ সরকার যদি এ বিরাট সংখ্যক অভিবাসীকে বের করে দেয়, তাহলে বিরাট রকম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে সমস্যা হলো লন্ডনবাসীর। লন্ডনবাসীরা কখনোই ব্রেক্সিট চায়নি। লন্ডন হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের লোকদের তুলনায় লন্ডনের মানুষের ইনকাম অনেক বেড়েছে। তারা কোনো কারণেই ব্রেক্সিট চায়নি। লন্ডন হচ্ছে গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল সেন্টার। সেই সেন্টার যদি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মূল ভূখ-ে চলে যায়, তাহলে তাদের বিরাট ক্ষতি হবে। কেউ বলছে না যে, তারা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মেইন ল্যান্ডে চলে যাবে। কিন্তু তারা আস্তে আস্তে অফিস গুটিয়ে নিচ্ছে। রাজনৈতিক কারণে কেউ বলবে না যে, তারা তাদের অফিস সরিয়ে নেবে বা তাদের এত হাজার লোক সরিয়ে নেবে; কিন্তু দেখা যাবে আস্তে আস্তে নতুন অফিস খুলছে বা লোকবল সরিয়ে নিচ্ছে। লন্ডনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই সন্দিহান হয়ে পড়েছে।

ষ ২০০০ সালে যখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের উদ্যোগে একক মুদ্রা ইউরো চালু করা হয় তখনও কিন্তু ব্রিটেন তাদের মুদ্রা পাউন্ড চালু রাখে। তাহলে কি তারা আগে থেকেই ব্রেক্সিটের মতো কোনো পদক্ষেপের ব্যাপারে প্রস্তুত ছিল?

ষষ ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও তারা কখনোই একাত্ম হয়ে যায়নি। ব্রিটেন সব সময়ই নিজেদের স্বাধীন সত্তা কিছুটা হলেও বজায় রেখে চলেছে। দুই-তিনটি ক্ষেত্রে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। এর একটি হচ্ছে মুদ্রা ব্যবস্থা। তারা কখনোই ইউরোতে জয়েন করেনি। একই সঙ্গে ব্রিটেন ইউরোপীয়ান একক ভিসা ব্যবস্থায় যোগদান করেনি। ব্রিটিশ সরকার সব সময়ই কিছুটা স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ব্রিটিশরা সব সময়ই তার স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখত।


 ব্রিটেনের সঙ্গে বাংলাদেশের চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশেষ করে বাণিজ্য এবং জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে এ দুইটি দেশের সম্পর্ক বরাবরই খুব ভালো। ব্রেক্সিটের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা প্রভাবিত হবে?

   দুঃখনজনক হলেও সত্যি যে, অনেক বাঙালিই কিন্তু ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক তারা ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তারা মনে করেছেন, যেহেতু পোলিশরা অনেক চাকরি নিয়ে নিচ্ছে, তাই বাঙালিরা বঞ্চিত হচ্ছে। এ ধারণা থেকে তারা ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। আমি মনে করি, বাঙালিদের এ চিন্তাভাবনা খুব একটা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নয়। যে গোষ্ঠী বা মহল এ ব্রেক্সিট আন্দোলন করেছে তারা কিন্তু চরম ডানপন্থী। তাদের কাছে যদি পোলিশরা গ্রহণযোগ্য না হয় তাহলে বাঙালিরা গ্রহণযোগ্য হবেÑ এটা ভাবা ঠিক নয়। যে কোনো দেশের মানুষ যদি বিদেশে থাকতে চায় তাহলে তাদের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তির ওপর। কাজেই ব্রেক্সিটের কারণে যদি ব্রিটিশ অর্থনীতি থমকে যায়, তাহলে তার প্রতিফলন আমাদের বাঙালি কমিউনিটির ওপরও পড়তে পারে। ব্রেক্সিটের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি এবং তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষতি হবে বলে আমার মনে হয় না। তবে আমাদের সচেতন থাকতে হবে এজন্য যে, ব্রিটেন যখনই ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসবে তখনই আমাদের ব্রিটেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। আগামী মাসগুলোতে ব্রিটেন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য নেগোসিয়েশন শুরু করবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে আমরা বাণিজ্য ক্ষেত্রে যেসব সুবিধা পাচ্ছিলাম ব্রিটেনের কাছ থেকেও যেন সে ধরনের সুযোগ-সুবিধা বজায় থাকে। এটা করা গেলে আমাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে বলে মনে করি। আর এজন্য আমাদের এখন থেকেই কাজ শুরু করতে হবে।

 সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এটা বাংলাদেশের অর্থনীতি; বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?

   এ হামলার ঘটনার তাৎক্ষণিক সাইকোলজিক্যাল ইম্প্যাক্ট পড়েছে। যে কারণে বিদেশিরা বাংলাদেশে আসাটা কমিয়ে দিয়েছে। প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসাটা বন্ধ করে দিয়েছিল। এখন আসছে কিন্তু কম পরিমাণে। নতুন করে আর কোনো ঘটনা না ঘটলে এটা ঠিক হয়ে যাবে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে ঘটনাটি ঘটেছে তা হলো, বাংলাদেশে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকদের পরিবারকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আমাদের দেশে জাপানের সহায়তায় বেশ কিছু বড় বড় প্রকল্পের কাজ চলছিল, তা কিছুটা হলেও থমকে গেছে। এরই মধ্যে সরকার নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছে। আগামীতে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তাহলে এ সমস্যা কেটে যাবে।

 গত পঞ্জিকা বছরে দেশে রেকর্ড পরিমাণ ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আহরিত হয়েছে। সন্ত্রাসী হামলার কারণে এ বিনিয়োগ কি বিঘিœত হবে বলে মনে করেন?

   সন্ত্রাসী হামলার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা হোঁচট খেতেই পারে। বিনিয়োগের দুইটি জিনিস আছে। একটি হচ্ছে চলমান বিনিয়োগ, এটা চলতেই থাকবে। বন্ধ হবে না। অন্যটি হচ্ছে নতুন বিনিয়োগ। নতুন বিনিয়োগ যেটা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল সেটা হয়তো পিছিয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হারিয়েও যেতে পারে। এ সন্ত্রাসী ঘটনা বিদেশি বিনিয়োগের ওপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তা এ মুহূর্তে ঠিক পরিমাপ করা সম্ভব নয়।


 জঙ্গি হামলার ঘটনা বিদেশি পর্যটকের বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে কতটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে বলে মনে করেন?

   বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে খুব যে আসে তা নয়। বাংলাদেশে আসে সাধারণত তৈরি পোশাক সামগ্রীর ক্রেতারা। তারা বাংলাদেশে এলে বিভিন্ন এলাকা ভ্রমণ করে থাকেন। এখন যারা তৈরি পোশাক বা অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশে আসেন, তারা প্রধানত ঢাকায় বসে আলোচনা করেই চলে যাচ্ছেন। তারা কোনো পর্যটন স্পট এখন তেমন একটা দেখতে যাচ্ছেন না। পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হলে তখন হয়তো তারা ঢাকার বাইরে বেড়াতে যাবেন। এ মুহূর্তে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক তেমন একটা নেই বললেই চলে।


 সরকার জঙ্গি হামলার বিষয়টি যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে, তা আপনি কীভাবে দেখছেন?

   আমি মনে করি, সরকার যেভাবে অগ্রাধিকার দিয়ে জঙ্গি দমন করছে, তা ঠিকই আছে। সরকারের এ উদ্যোগ এরই মধ্যে বেশ ভালো ফল দিয়েছে। যদিও এ ব্যাপারে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে যে, যেভাবে জঙ্গিদের মেরে ফেলা হচ্ছে সেটা ঠিক হচ্ছে কিনা। যদি তাদের জীবিত অবস্থায় আটক করা যেত তাহলে তাদের কাছ থেকে আরও তথ্য বের করা যেত। বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা যেত। জঙ্গি দমনের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং চীনের কাছ থেকে সহায়তার প্রস্তাব এসেছে। আমি মনে করি, এ সহযোগিতার প্রস্তাব সরকারের গ্রহণ করা উচিত। হয়তো সরকার রাজনৈতিক কারণে বিদেশের সহায়তা নিতে চাচ্ছে না। কিন্তু আমাদের ফাইট এগেইনস্ট টেরোরিজম রজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে ওঠে করতে হবে। শুধু নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে সন্ত্রাস দমন করা যাবে না। এজন্য আরও ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে, জনগণকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সবাইকে নিয়ে রাজনৈতিকভাবে জঙ্গি সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। সামাজিকভাবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বেকার সমস্যা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে।
 সম্প্রতি ভারত সে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য প্যাকেজ সুবিধা ঘোষণা করেছে। বিশেষ করে; এ শিল্পের জন্য ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ ভর্তুকি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতের এ সিদ্ধান্ত কি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করবে না?

   আমি জানি না এ তথ্যটি কতটা সত্যি। কারণ ডব্লিউটিও এ ধরনের ব্যবস্থা খুব একটা অনুমোদন করে না। ডব্লিউটিও বাংলাদেশকে অনেক ধরনের সুবিধা প্রদান করে থাকে। কিন্তু ভারতকে দেয় না। আমি শুধু এটুকুই বলব, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক সামগ্রী এখনও ভারতের তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক সুবিধা আমরা বজায় রাখতে পারছি। আগামীতেও এটা বজায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক সুবিধার বিষয়টি ধরে রাখার জন্য আমাদের অভ্যন্তরীণভাবে চেষ্টা চালাতে হবে। সড়ক যোগাযোগ এবং অন্যান্য সমস্যা সমাধান করতে হবে। বিদ্যুৎ-গ্যাস সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদাবাজি দূর করতে হবে।


 গত বছর আগের বছরের তুলনায় জনশক্তি রফতানি খাতের প্রবৃদ্ধি কমেছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?


   জনশক্তি রফতানি কিন্তু কমেনি। আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ বিদেশে গেছে। এটা একটা উল্লেখযোগ্য দিক। কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, রেমিট্যান্স আগমন কমেছে। এটা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। আমার মনে হয়, এখানে আমাদের কিছু নীতিগত সমস্যা রয়েছে। মুদ্রার বিনিময় হারের কারণে অনেকেই বৈধ চ্যানেলে টাকা প্রেরণ করছে না। তারা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা প্রেরণ করছে। অনেকেই নানা উপায়ে মুদ্রা পাচার করছে। এ কারণেও রেমিট্যান্স আহরণ কমেছে। অনেকেই উপার্জিত টাকা দেশে না এনে বিদেশেই রেখে দিচ্ছে।

আলোকিত বাংলাদেশ : আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. আহসান এইচ মনসুর : আপনাদেরও ধন্যবাদ।

http://www.alokitobangladesh.com/todays/details/201473/2016/11/29

 

Speech