Policy Research Institute - PRI Bangladesh

The Policy Research Institute of Bangladesh (PRI) is a private, nonprofit, nonpartisan research organization dedicated to promoting a greater understanding of the Bangladesh economy, its key policy challenges, domestically, and in a rapidly integrating global marketplace.

পারিবারিক সঞ্চয়ের বিনিয়োগ নিয়ে সংশয়

Published: Tuesday, May 22, 2012

পারিবারিক সঞ্চয়ের বিনিয়োগ নিয়ে সংশয়

মঙ্গলবার, মে ২২, ২০১২। বণিকবার্তা
ড. আহসান মনসুর

বাংলাদেশের জাতীয় সঞ্চয় মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপির) প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ক্রমেই বাড়ছে এটি।

edএর মধ্যে স্থানীয় বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আমাদের মোট দেশজ সঞ্চয়ের (গ্রস ডোমেস্টিক সেভিংস) পরিমাণ জিডিপির ২০ শতাংশের কাছাকাছি। গত বছরগুলোয় জাতীয় আয়ের ১০ শতাংশেরও বেশি অর্থের সঞ্চয় হয়েছে রেমিট্যান্স থেকে। বাংলাদেশে এখনো সামগ্রিক সঞ্চয়ের পরিষ্কার বিভাজন জানা নেই। ফলে করপোরেট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয় এবং পারিবারিক সঞ্চয়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা সম্ভব নয়। সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয়, বাংলাদেশের জাতীয় সঞ্চয়ে পারিবারিক সঞ্চয়ের বড় অবদান রয়েছে।

পারিবারিকভাবে সঞ্চিত অর্থ নির্দিষ্ট কয়েকটি পথে একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে এবং বিনিয়োজিত হয় সামগ্রিক অর্থনীতির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। নতুন বিনিয়োগের জন্য তহবিল গঠনে সহায়তা জোগানোর মধ্য দিয়ে স্থানীয় অর্থনীতির ভবিষ্যত্ প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে এ ধরনের সঞ্চয়। আবার এটি কাজ করে মানুষের উত্পাদনশীল জীবন বা কর্মজীবনের শেষে ভবিষ্যত্কালীন আয় হিসেবে। এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য কিছু সম্পদের ব্যবস্থাও করা হয়। ফলে যেকোনো পরিবারের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হলো, উচ্চ লাভজনক বিনিয়োগে সঞ্চয় বরাদ্দ করা। সমস্যা হলো, এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর সুযোগ অনেকটাই সীমিত। এতে দেখা যায়, অধিকাংশ পরিবার পুরনো বিনিয়োগ কৌশলে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ তথা সঞ্চয় বিনিয়োগ করছে যেমন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন মেয়াদে অর্থ জমা রাখা, জাতীয় সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ড, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এবং বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট ও জমিতে বিনিয়োগ। 

অন্যান্য দেশের মতো দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের মাধ্যম (উদাহরণ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক পেনশন তহবিলের কথা বলা যেতে পারে) বাংলাদেশে অনুপস্থিত। এতে বেশির ভাগ পরিবার অধিকাংশ সময় তাদের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ করে উল্লিখিত চারটি পদ্ধতিতে। যেকোনো উন্নয়নশীল অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থায় পারিবারিক সঞ্চয়ের এমন বিনিয়োগ মোটেই অস্বাভাবিক নয় বরং সাধারণত এটিই হয়ে থাকে। বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাংলাদেশী পরিবার পারিবারিক সঞ্চয়ের বিনিয়োগ শুরু করে ব্যাংকে আমানত রাখার মধ্য দিয়ে। পরবর্তী সময়ে সঞ্চয়ের কিছু অর্থ চলে যায় শেয়ারবাজার, নয়তো গৃহায়ণ খাতের বিনিয়োগে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে এক টুকরো জমি কেনার উদ্যোগ নেয়া হয় এবং পরে পর্যাপ্ত সঞ্চয় হলে নেয়া হয় নিজেদের থাকার জন্য বাড়ি তৈরি বা কেনার প্রচেষ্টা। 

বাংলাদেশীদের অর্থ সঞ্চয় এবং তা ব্যবহারের এ স্থিতিশীল ও অনুমানযোগ্য বিন্যাসে কয়েক বছর ধরে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এ সময়ে পারিবারিক সঞ্চয়ে ব্যাপক বিনিয়োগ ঘটেছে শেয়ারবাজার ও গৃহায়ন খাতে। গত বছরগুলোয় সারা দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার ও জমির দামের যে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে তার অন্যতম কারণ হলো— এ দুই খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পারিবারিক সঞ্চয়ের বিনিয়োগ। এ ধরনের বিনিয়োগ আবার বাবল (বুদ্বুদ) সৃষ্টি করেছে গৃহায়ণ খাতে ও করেছিল শেয়ারবাজারে। এখন অনেকেই অতিলাভের প্রচারণায় প্রলুব্ধ হয়ে পারিবারিক সঞ্চয় বিনিয়োগ করছেন মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ে (এমএলএম), যারা আবার বহুলাংশে বিনিয়োগ করছেন জমিতে। এদের প্রত্যাশা, অচিরেই এমএলএম থেকে অযৌক্তিক রকমের বড় প্রাপ্তি ঘটবে। কিন্তু এ ধরনের মূল্য বৃদ্ধি বেশি দিন চলতে পারে না— যখন অর্থপ্রবাহ কমে আসে, ঢেউ সৃষ্টি হয় শেয়ারবাজার ও গৃহায়ণ খাতে। এসবের মধ্যে শেয়ারবাজার বেশি অস্থিতিশীল ও স্পেকুলেটিভ হওয়ায় বাবল ফাটতে দেরি হয়নি। গৃহায়ণ খাত তুলনামূলক স্থিতিশীল হওয়ায় এ বাজারের বাবল এখনো ফাটেনি; ফাটার উপক্রম হয়েছে মাত্র। এ খাত যে ক্রমে সংকুচিত হবে সে লক্ষণও দেখা দিয়েছে এরই মধ্যে। তবে শেয়ারবাজারের মতো এটি স্বশব্দে ফাটবে না, এটি সংকুচিত হবে নীরবে।

শেয়ারবাজারে সৃষ্ট বাবল নাটকের কিছু উপাত্ত দেয়া যাক। তাতে দেখা যাবে, বিপর্যয়ের আগে গত আট বছরেরও কম সময়ে ১০ গুণ বেড়েছিল শেয়ারের দাম। অর্থাত্ এ সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ে প্রায় ১ হাজার শতাংশ। ডিএসইর (ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ) বাজার মূলধনিকরণ (মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন) হিসাব দেখাচ্ছে, ২০০০ সালের ডিসেম্বরে নিবন্ধিত শেয়ারের মোট পরিমাণ ছিল জিডিপির ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ৪৭ শতাংশে পৌঁছে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে। শেয়ারের সর্বোচ্চ মূল্য বৃদ্ধির ঘটনা ঘটে তখন। মোটামুটি একই নাটক ধীরগতিতে মঞ্চস্থ হচ্ছে গৃহায়ণ খাতেও। ছয় বছর আগে বারিধারা, গুলশানের মতো রাজধানীর অভিজাত এলাকায় প্রতি বর্গফুট অ্যাপার্টমেন্ট স্পেস বিক্রি হতো ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায়। একই পরিমাণ স্পেস ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে কিছু দিন আগেও। তার মানে স্পষ্টত বাবল বড় হয়েছে অনেক। এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কিন্তু শুধু শহর ও শহরতলিতে সীমাবদ্ধ নয়। আপনি গ্রামে যান, বুঝতে পারবেন সারা বাংলাদেশের ভূমির মূল্য কেমন ফুলেফেঁপে উঠেছে এ ধরনের অ্যাসেট বাবলের কারণে। 

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে জমির লেনদেন হয় কমই। এ ক্ষেত্রে ক্রেতা বেশি, বিক্রেতা কম; তার ওপর জমির সরবরাহ সীমিত। এতে গ্রামেও হু হু করে বাড়ছে জমির দাম। আগেই বলেছি, এসব প্রতিটি ক্ষেত্রে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে এমএলএমের মতো কিছু স্পেকুলেটিভ খাতে হওয়া পারিবারিক সঞ্চয়ের বিপুল বিনিয়োগ। আমার নিজ গ্রামে পাঁচ বছর আগে ১ শতাংশ (ডেসিমেল) কৃষিজমির দাম ছিল কমবেশি ৪ হাজার টাকা (প্রতি একর আনুমানিক ৪ লাখ টাকা)। আর এখন ১ শতাংশ জমি বিক্রি হচ্ছে ৩০ হাজার টাকায়; প্রতি একর প্রায় ৩০ লাখ টাকা।

বিনিয়োগকারী হিসেবে চিন্তা করুন। এসব ক্ষেত্রে তাদের বিনিয়োগ থেকে আয়ের হার (রেট অব রিটার্ন) অন্যান্য খাতের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি। ফলে এটি ক্রমাগত উত্সাহিত করে যাচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক খাতের বিনিয়োগের (লংগার ম্যাচিউরিটি সেভিংস ইনস্ট্রুমেন্টস) বদলে গৃহায়ণ ও অস্থিতিশীল শেয়ারবাজারের মতো স্পেকুলেটিভ মার্কেটে সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগে। এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ একটা স্তর পর্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োচিত, যদি বাবল ফাটার আগেই মুনাফা তুলে নিয়ে থাকেন কেউ। এরই মধ্যে ২০১১ সালে শেয়ারবাজার বাবল আমরা ফাটতে দেখেছি। আমার যুক্তিসিদ্ধ অনুমান, গৃহায়ণ খাতের বাবলও দীর্ঘস্থায়ী হবে না। আগেই বলেছি, শেয়ারমূল্যের মতো সহসা কমে না জমি বা বাড়ির মূল্য। তার মূল কারণ, শেয়ারবাজারের চেয়ে তারল্য প্রবাহ কম এ খাতে।অনেকে লক্ষ করে থাকবেন, সম্প্রতি অনেক রিয়েল এস্টেট কোম্পানি বড় ছাড় (ডিসকাউন্ট) দিচ্ছে সম্ভাব্য অ্যাপার্টমেন্ট ক্রেতাদের। জানা গেছে, এরই মধ্যে বিক্রি কমেছে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ। তা সত্ত্বেও কিছু উদাসীন বিনিয়োগকারী মনে করেন, বাংলাদেশে অ্যাসেট বাবল ফাটবে না; যদি ফাটেও তা হবে অনেক দেরিতে। এমন ধারণা থেকে অধিক মুনাফার আশায় তারা বিনিয়োগ করেই যাচ্ছেন গৃহায়ণ খাতে; তার সঙ্গে বাড়াচ্ছেন জমি ও অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য। খুবই দুঃখজনক হবে যদি অতিমূল্যে শেয়ার কিনে পথে বসা মানুষদের পরিণতি বরণ করতে হয় তাদেরও। এ-সংক্রান্ত কিছু বিষয় ব্যাখ্যা করি। স্বাভাবিক অবস্থায় কী ঘটে? রিয়েল এস্টেটের দাম বাড়ে ধীরে, কিন্তু স্পষ্টভাবে। আর বাংলাদেশে ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট ও জমির দাম বেড়েছে অযৌক্তিক তথা অস্বাভাবিকভাবে। এসবের দাম ও একই পরিমাণ স্পেস ভাড়ার একটি সম্পর্ক দেখানো হয় অর্থনীতিতে। এতে বলা হয়, সাধারণভাবে কোনো স্পেসের মাসিক ভাড়া হওয়া উচিত একই স্পেসের অন্তর্নিহিত (ওসঢ়ষরপরঃ) বিক্রয় মূল্যের ১ শতাংশ। এই সাধারণ হিসাবের তত্ত্বটি এ মুহূর্তে বাংলাদেশের কোথাও প্রয়োগ হচ্ছে বলে আমার জানা নেই। ভালোভাবে তৈরি গুলশানের একটি ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের ৩ হাজার ৩০০ বর্গফুট স্পেসের মাসিক ভাড়া ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রতি বর্গফুট স্পেস বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা হিসাবে। এতে ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টের দাম পড়বে ৬ কোটি ৬০ লাখ থেকে ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা, যার সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত হবে বিরাট অঙ্কের নিবন্ধন ফি ও অন্যান্য খরচ। তাহলে এই ফ্লাটের বিক্রয় মূল্যের সঙ্গে মাসিক ভাড়ার অনুপাত হবে শূন্য দশমিক ২৪ থেকে শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১ শতাংশের অনেক নিচে। ধরা যাক, ফ্ল্যাটটির সর্বনিম্ন সম্ভাব্য বিক্রয় মূল্য ৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা। মাসিক ১২ শতাংশ সুদের হারে একই পরিমাণ টাকা থেকে প্রতি মাসে ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকার মতো আয় করা সম্ভব। তাহলে ওই সব ফ্ল্যাটের ভাড়া কি বিনিয়োগ মূল্যের সঙ্গে মোটেও সঙ্গতিপূর্ণ? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জবাব আসবে, না। আরও বিষয় আছে। সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তির অবমূল্যায়ন ঘটে; ভাড়াকৃত সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়ও টানতে হয় বাড়ির মালিককে। এসব বিবেচনায় নিলে বর্তমানে রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে যে পরিমাণ মাসিক ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, তার সঙ্গে ওই বাড়ির ক্রয়মূল্যকে সঙ্গতিপূর্ণ বলা যায় না। তা সত্ত্বেও এক ধরনের অস্বাভাবিক মুনাফার লোভেই মানুষ পারিবারিক সঞ্চয় বিনিয়োগ করছে গৃহায়ণ খাতে।

যুক্তি দেখাতে পারেন, অধিকাংশ ক্রেতা ভূসম্পত্তি কেনেন নিজ বাসস্থান নিশ্চিত করতে। ফলে আলাদাভাবে বাসস্থানের সুযোগ নিতে গিয়ে খরচ করতে হচ্ছে ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্টের ভবিষ্যত্ মালিককে। এটি একটি খোঁড়া যুক্তি। কেউ কেউ বলেন, যে সময় ফ্ল্যাটটি কেনা হয়েছিল তার সঙ্গে মূল্যস্ফীতিজনিত দাম যোগ করা হলে তো স্পেসের দাম ও মাসিক ভাড়ার অনুপাতটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের মধ্যেই থাকে। এভাবে ভাড়া দিয়ে হোক বা বিক্রি করেই হোক, রিয়েল এস্টেট ব্যবসা সবসময়ই লাভজনক। এমন যুক্তি বেশি শোনাতে দেখা যায় রিয়েল এস্টেট বিপণনকারীদের (অবশ্য এটি তাদের পেশাগত দায়িত্বও বটে)। তাদের উদ্দেশ্যও থাকে বিনিয়োগকারীর লোকসানের বিনিময়ে বিক্রেতাকে লাভবান করা। সম্প্রতি একটি জমিসংক্রান্ত লেনদেনে সমঝোতাকারীর ভূমিকা নিতে হয়েছিল আমাকে। ঘনিষ্ঠ একজন নিয়ে গিয়েছিল পূর্বাচল এলাকায় এক বেসরকারি ল্যান্ড ডেভেলপারের সঙ্গে কথা বলতে। প্রতিষ্ঠানটি বোঝানোর চেষ্টা করছিল, কাঠাপ্রতি (একরের ৬০ শতাংশের ১ শতাংশ) ১৫ লাখ টাকা বাজার মূল্যের বিপরীতে তারা একই জমি দিচ্ছেন ১৩ লাখ টাকায়। লোভনীয় প্রস্তাব সন্দেহ নেই। তবে একটু গভীরভাবে তলিয়ে দেখে বুঝলাম, গত কয়েক বছরের অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধির পর নিকট ভবিষ্যতে ওই জমির দাম বাড়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ; কমার সম্ভাবনা রয়েছে বেশ।

জমি ও রিয়েল এস্টেটের দামের একটি পর্যাবৃত্ত চক্র (পিরিয়ডিক সাইকেল) রয়েছে। চক্রের শুরুতে এসবের দাম বাড়তে থাকে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর বাজার সংশোধন (মার্কেট কারেকশন) হয়ে দাম পড়তে থাকে আবার। এমন চক্র সাধারণত পাঁচ-সাত বছর স্থায়ী হয়। গত পাঁচ-সাত বছরের দ্রুত মূল্য বৃদ্ধির পর এখন যারা ভাবছেন প্লট কিনে তাতে ভূমি উন্নয়ন করে বাসাবাড়ি বানানোর কথা, তাদের বলে রাখি— নিকট ভবিষ্যতে মূল্য বৃদ্ধি না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সে ক্ষেত্রে বর্তমানের স্ফীত মূল্যে পারিবারিক সঞ্চয়ের এমন বিনিয়োগে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাই বরং বেশি। এ ক্ষেত্রেও শেয়ারবাজারের সঙ্গে কিছুটা তুলনা করা যায়। কেউ যদি এ ধরনের স্পেকুলেটিভ বিনিয়োগে সর্বোচ্চ দামে জমি বা রিয়েল এস্টেট বিক্রি করে দিতে পারেন, তারা লাভবান হবেন। আবার তারাও লাভবান হবেন, যারা সর্বনিম্ন দামে এসব কিনে রাখতে পারবেন। আমার ধারণা, আগামী চার-পাঁচ বছরে জমি ও অ্যাপার্টমেন্টের দাম কমে আসবে। সে ক্ষেত্রে এখনকার সঞ্চিত অর্থই বিনিয়োগ করা হলে কেনা যাবে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেশি জমি। একই যুক্তি খাটবে অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও। বলছিলাম গুলশান এলাকার অভিজাত ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া ও দামের কথা। দামের ক্ষেত্রে এটি ষাঁড়ের গতিতে (বুল রান) দৌড়িয়েছে এত দিন। আগামী বছরগুলোয় এ ‘বুল রান’ থাকবে না। ফলে এসব ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট না কিনে কেউ যদি এ ধরনের ফ্ল্যাটে ভাড়াও থাকেন, তিনি আগামী পাঁচ বছরে সাশ্রয় করতে পারবেন ৩ কোটি ৬০ লাখ থেকে ৪ কোটি টাকা।
এসব যুক্তি দেখানো হলে অনেক অর্থনীতিবিদ ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীই একটি সাধারণ জবাব দেন তা হলো, বাংলাদেশ বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশের অন্যতম। এখানে মাথাপিছু জমির সংকট রয়েছে। তার ওপর আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। ফলে রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগে ঝুঁকি কম বরং লাভজনক স্পেকুলেটিভ ব্যবসা এটি। তবে আমার কাছে কিছু তথ্য-উপাত্ত রয়েছে, যেগুলো বলছে ভিন্ন কথা। প্রধানত এশিয়ার আর্থিক সংকটের (এশিয়ান ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস) কারণে হংকংয়ের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দ্বীপে জমি ও রিয়েল এস্টেটের দাম নামতে নামতে ৬০ শতাংশ কমে গিয়েছিল ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের দিকে। দেশটির সামগ্রিক গৃহায়ই সূচক (টোটাল হাউজিং ইনডেক্স) পুনরায় আগের উচ্চপর্যায়ে ফিরে যেতে সময় লাগে প্রায় এক যুগ। জমির দুষ্প্রাপ্যতার কথাই যদি যুক্তির ভিত্তি হয়, জাপানের বিষয়টিও উল্লেখ করা যেতে পারে এ ক্ষেত্রে। মাথাপিছু জমির সংকট রয়েছে সেখানেও। তা সত্ত্বেও দেশটির গৃহায়ই খাতে রেকর্ড পতন লক্ষ করা যায় দুই দশক আগে। জাপানে জমি ও ফ্ল্যাটের দাম প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছিল সে সময়। দেশটির অর্থনীতিতে সম্পদ বাবল সৃষ্টি হয় ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সালে। এতে রিয়েল এস্টেট ও শেয়ারের দাম (আমাদের দেশের সঙ্গে মিল রয়েছে) বাড়ে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণের মতো। জাপানের অর্থনীতিতে বাবলটি স্থায়ী হয়েছিল মাত্র দুই বছর। এর পরই ফেটে যায় তা আর ঘটে বিশ্ব আর্থিক বাজারের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয়। জানা গেছে, মুম্বাই রিয়েল এস্টেট বাজারেও ফ্ল্যাটের নমিনাল ভ্যালু (নামমূল্য) ৩০ শতাংশ কমেছে সম্প্রতি আর দুবাইয়ে দাম পড়েছে ৫০ শতাংশ। পতন শুরু হয়েছে কয়েকটি প্রধান চীনা শিল্প নগরীর রিয়েল এস্টেটের দামেও। এরই মধ্যে সেগুলোর দাম কমেছে ৩০ শতাংশের মতো, আগামী বছরগুলোয় তা আরও কমবে বলে ধারণা। আমার বক্তব্য হলো, এসব দেশের অর্থনীতি বাংলাদেশের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তাদের সঞ্চয়ের পরিমাণ ও নতুন বাসস্থান জোগাতে জনতাত্ত্বিক চাপও (ডেমোগ্রাফিক প্রেসার) আমাদের চেয়ে বেশি। ফলে কোনো আঘাত এলে তা সহ্য করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। কিন্তু আমাদের তেমন সক্ষমতা কোথায়? 

আসলে বিনিয়োগের আগে পারিবারিক সঞ্চয়কারীদের অর্থনীতির কিছু মৌল বিষয়ে ধারণা থাকা দরকার। যেমন রিয়েল এস্টেটের দাম যখন মানুষের সম্ভাব্য উপার্জনের বাইরে চলে যায়, বুঝতে হবে মার্কেট কারেশনের সময় এসেছে; এ ক্ষেত্রে মূল্য সংশোধনের পরই বিনিয়োগ করা ভালো। প্রশ্ন তুলতে পারেন, তাহলে এখন কোথায় অর্থ বিনিয়োগ করবেন পারিবারিক সঞ্চয়কারীরা? শেয়ারের অতিমূল্যায়ন হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তা সংশোধনও হয়েছে। বেশ কয়েকটি বড় সংশোধনীর পর যৌক্তিক পর্যায়ে এসেছে শেয়ারের দাম। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগের জন্য পারিবারিক সঞ্চয়কারীদের ভালো ক্ষেত্র এখন শেয়ারবাজার। তবে কোনোমতেই স্বল্পমেয়াদি মুনাফার লক্ষ্য নিয়ে এতে ঝাঁপিয়ে পড়া ঠিক হবে না। অতিক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্যও শেয়ারবাজার নয়। এদিকে আমাদের রিয়েল এস্টেটেও অন্যান্য দেশের মতোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজার সংশোধনী শুরু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে আমার পরামর্শ, এখন এ বাজারে আসা বোকামি হবে। বাজার মূল্য সংশোধিত হোক, তারপর বিনিয়োগ করুন এতে। একইভাবে এমএলএমে যারা বিনিয়োগ করতে, আগ্রহী তাদের সতর্ক করতে চাই— পিরামিড স্কিমে বিনিয়োগ করবেন না; জমির বাজারের মতো এটিরও ‘বুল রান’ শেষ হবে অচিরেই। তখন আপনারা তারল্যস্বল্পতায় ভুগবেন, এমনকি দেউলিয়াও হতে পারেন অনেকে।

আমার কাছে মনে হয়, নিকট ভবিষ্যতের জন্য পারিবারিক সঞ্চয়ের সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ হতে পারে অর্থবাজারে। এতে তারল্য ঘাটতি চলছে বর্তমানে। তার আংশিক কারণ হচ্ছে এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের অভাব। কিছু দিন আগ পর্যন্ত অনেক বিনিয়োগকারীই অস্বাভাবিক মুনাফার প্রলোভনে ছুটেছিলেন রিয়েল এস্টেট ও শেয়ারবাজারের মতো স্পেকুলেটিভ মার্কেটে। অনেকে ছোটেন আরও বেশি (৬০ শতাংশের কম নয়) মুনাফার অতিঝুঁকিপূর্ণ এমএলএম বিনিয়োগে। এসব কারণে কাঙ্ক্ষিত তারল্য প্রবাহ নেই অর্থবাজারে। ফলে আমানত সংগ্রহে উঠে পড়ে লেগেছে ব্যাংকগুলো। এদিকে অর্থনীতিতে ঋণের চাহিদাও বেড়ে উঠেছে খানিকটা। এমন প্রেক্ষাপটে তারল্য সংকট ও ঋণের চাহিদা— এ দুয়ে মিলে আমানতের সুদের হারও বাড়ছে।

দেখা যাচ্ছে, শেয়ারবাজার অস্থিতিশীল; গৃহায়ণ খাত অতিমূল্যায়িত আর পিরামিড স্কিমের (এমএলএম ব্যবসায়) বিপর্যয় প্রায় অনিবার্য। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক সঞ্চয়কারীরা লাভবান হবেন অর্থবাজারে বিনিয়োগ করলে। এতে পুঁজির সংরক্ষণ হবে, যৌক্তিক হারে উচ্চমুনাফাও পাবেন তারা। আবার আমানত বাড়ার মধ্য দিয়ে ব্যাংকব্যবস্থার তারল্য সংকট দূর হবে, দেশের অর্থনীতি হবে আরও বিকশিত। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। তা হলো তফসিলি ব্যাংকগুলো যাতে আমানতে প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার বজায় রাখে, সেটি বাস্তবায়নে নজরদারি করা।

লেখক: অর্থনীতিবিদ নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই)

Speech