শুল্ক প্রতিবন্ধকতার কারণেই রফতানি বহুমুখীকরণ হচ্ছে না

সংস্কার : অর্থনীতি, ব্যাংক ও রাজস্ব

শুল্ক প্রতিবন্ধকতার কারণেই রফতানি বহুমুখীকরণ হচ্ছে না

আমাদের শুল্ক কাঠামো জটিল। একটি সহজ শুল্ক কাঠামো হতে পারে। আমাদের নমিনাল ট্যারিফ বা তৈরি পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্কের গড়হার হচ্ছে ২৮ শতাংশ। কিন্তু সব বাণিজ্য কর মেলালে গড়হার হয় ৫৫ শতাংশ।

বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির অন্তরায় হিসেবে এখানকার শুল্ক কাঠামো নিয়ে বেশকিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এক্ষেত্রে আমাদের শুল্ক ও আমদানি নীতির মৌলিক সমস্যাগুলো আসলে কোন জায়গায় এবং সেগুলোর দ্রুত সমাধান কেমন হতে পারে?

আমাদের শুল্ক কাঠামো জটিল। একটি সহজ শুল্ক কাঠামো হতে পারে। আমাদের নমিনাল ট্যারিফ বা তৈরি পণ্যের ওপর নির্ধারিত শুল্কের গড়হার হচ্ছে ২৮ শতাংশ। কিন্তু সব বাণিজ্য কর মেলালে গড়হার হয় ৫৫ শতাংশ। তাদের বক্তব্য হলো যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানিতে আরোপিত কর ও শুল্কহার ৩ শতাংশ আর বাংলাদেশে ৫৫ শতাংশ, এটা তো হতে পারে না। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমাদের শুল্ক কাঠামোকে আরো সহজ করতে হবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) শুল্ক কাঠামোকে কেবল জটিলই করেনি, অস্বচ্ছও করে তুলেছে। বিষয়টি ইউএসটিআরের (ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ) মূল্যায়নেও উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে, এ শুল্ক কাঠামো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কার্যকর হবে না। বরং এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি বিরাট বাধা। শুধু তাই নয়, এই জটিল শুল্ক কাঠামোর মধ্যে যে সংরক্ষণ নীতি আছে, সেটিও আমাদের রফতানির বৈচিত্র্যায়ণ ও বহুমুখীকরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখন ইউএসটিআরও বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য করতে হলে বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতি সহজ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এ বার্তার ওপর ভিত্তি করে দ্বিপক্ষীয়ভাবেও আমাদের বাণিজ্য নীতি সংস্কার শুরু করা যেতে পারে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আছে। তাদের জন্যও আমাদের বাণিজ্য নীতি সহজ করা যেতে পারে। তাতে আমার মনে হয় না রাজস্ব আহরণের খুব একটা প্রভাব পড়বে। কারণ আমরা সবচেয়ে বেশি আমদানি করি চীন ও ভারত থেকে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে হয় বড় অর্থনীতির সঙ্গে। ভুটানের সঙ্গে এফটিএ করা হচ্ছে সময়ের অপচয়। বরং এ সুযোগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এফটিএ করতে পারলে সেটিই ভালো হবে।

তৈরি পোশাক খাতে একটি বড় ধাক্কার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। খাতটি এ ধাক্কা মোকাবেলা করতে পারে কীভাবে?

শুধু তৈরি পোশাক নয়, জুতা বা ফুটওয়্যারেরও বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ফুটওয়্যার রফতানি ৩০-৪০ শতাংশ হারে বাড়ছিল। জুতার সবচেয়ে বড় রফতানিকারক দেশ চীন। এরপর ভিয়েতনাম। ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রে অনেক রফতানি করে। কিন্তু এ রফতানির মধ্যে চীনা ইনপুটস আছে। এমনকি ভিয়েতনাম যেসব ইলেকট্রনিকস পণ্য রফতানি করে, সেখানেও চীনা ইনপুট ও ইন্টারমিডিয়েট গুডস ব্যবহার হয়। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ভিয়েতনামকে বলেছে রফতানি করবে আমাদের দেশে আর আমদানি করবে চীন থেকে, তা হবে না। কোনো পণ্য চীন থেকে ট্রান্সশিপমেন্ট করা হলে সেটির ওপর ৪০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হবে।

আমাদের জুতা ও পোশাক শিল্পে চীন থেকে কিছু আমদানি আছে। তৈরি পোশাকে, বিশেষ করে নিটওয়্যারের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের হার এখন প্রায় ৮০-৯০ শতাংশে চলে গেছে। তবে ওভেন গার্মেন্টের ক্ষেত্রে অনেক আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রে বর্তমানে যে আমদানি চীন থেকে করা হচ্ছে; সেটি যদি ভারত, পাকিস্তান বা শ্রীলংকা থেকে করা হয় তাহলে ট্রান্সশিপমেন্টের যে মাশুল, সেটি হয়তো একটু এড়ানো যেতে পারে। তবে আমার মনে হয় আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে। জুতা বা ফুটওয়্যারের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু এ ফুটওয়্যারেরও অনেক কিছু চীন থেকে এসে ঘুরে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ফুটওয়্যারের চামড়া আমদানি বেশি হয় না। কিন্তু চামড়াবহির্ভূত ফুটওয়্যারের ক্ষেত্রে গার্মেন্টের মতোই আমদানি করতে হয়। আমদানি কোথা থেকে করতে হবে, সেটি ভাবতে হবে। চীন থেকে আমদানি করলে শুল্ক বেশি পড়বে। সামনের দিনগুলোয় এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

তৈরি পোশাক শিল্পে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কর্মসংস্থান সেভাবে বাড়ছে না। এক্ষেত্রে বৈচিত্র্যায়ণের জন্য চামড়ার মতো আর কোন কোন শিল্পে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে?

তৈরি পোশাক খাত সম্প্রসারিত হলে আগে যে রকম কর্মসংস্থান তৈরি হতো, তার চেয়ে এখন কম হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়ছে। আমরা তো উৎপাদনশীলতাও চাই। আমরা পোশাক পণ্য রফতানি করি ২১৬টি। আর অন্যদিকে নন-গার্মেন্ট পণ্য হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি। এর মধ্যে ৬০০টির ক্ষেত্রে আমরা প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় আছি। আন্তর্জাতিকভাবে এই প্রতিযোগী সক্ষমতা নিয়ে আমাদের তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। সুতরাং আমরা আরো ৩০০-৫০০ ধরনের পণ্য রফতানি করতে পারি। আমি মনে করি, রফতানির ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকের পর ফুটওয়্যারের অবস্থান হওয়া উচিত। আমরা এখন চামড়াজাত ও ফুটওয়্যার পণ্য রফতানি করছি ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন (১৬০ কোটি) ডলারের। এটা অনেক বেশি হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে তৈরি পোশাক শিল্পের যে কাঠামো আছে, ফুটওয়ার শিল্পেও তা একই রকম। কারণ নাইকি, এডিডাস ও রিবকের মতো বড় বড় জুতার ব্র্যান্ডগুলোর কিন্তু নিজস্ব কোনো কারখানা নেই। এসব ব্র্যান্ডের জুতা উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও ভিয়েতনামে তৈরি পোশাকের মতো ক্রয়াদেশ দেয়া হয়। তারপর এসব দেশে বানানো জুতা তারা যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করে। যুক্তরাষ্ট্রের কথা হচ্ছে, তোমরা আমাদের এখানে রফতানি করো ঠিকই, কিন্তু ট্রান্সশিপমেন্ট বা আমদানি করো অন্য দেশ থেকে। এখানে তারা কোনো দেশের নাম বলছে না। যদিও মূল লক্ষ্য হচ্ছে চীন থেকে যেন কোনো পণ্য আমদানি না করা হয়।

আমাদের পণ্য অনেক আছে, যেগুলো আমরা রফতানি করতে পারি। এর মাধ্যমে আমাদের রফতানি বহুমুখীকরণ হতে পারে। কিন্তু সেখানেও বাধা হয়ে উঠেছে শুল্ক কাঠামো। কীভাবে? এ উচ্চশুল্ক দিয়ে আমরা দেশীয় বাজারে মুনাফার হার অনেক বাড়িয়ে রেখেছি। শুল্ক দিয়ে দেশীয় বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে উদ্যোক্তাদের মুনাফাও বেড়ে যায়। এভাবে শুল্ক দিয়ে মুনাফা বাড়িয়ে রাখার অর্থ হলো যেগুলো আমরা রফতানি করতে পারি, সেগুলো আমাদের দেশে বিক্রি হচ্ছে। গার্মেন্ট শিল্প হচ্ছে শতভাগ রফতানিমুখী শিল্প। কিন্তু অন্যগুলো সাধারণত দেশীয় বাজারে বিক্রি হয়, আবার রফতানিও হয়। যেমন জুতা, সিরামিকস ও প্লাস্টিক পণ্য। এর মধ্যে কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী যখন দেখে রফতানিতে মুনাফা নেই এবং অনেক কষ্ট হয়, তখন সে রফতানি করে না। এমনকি জুতাও রফতানি না করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করলে অনেক বেশি লাভ। শুল্ক প্রতিবন্ধকতার কারণেই আমাদের রফতানি বহুমুখীকরণ হচ্ছে না।

তৈরি পোশাক শিল্পের পর চামড়া শিল্প থেকে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সেটি না হওয়ার পেছনে প্রতিবন্ধকতাগুলো কোথায়?

আমাদের যদি জুতা রফতানি করতে হয়, তাহলে এজন্য যে চামড়া লাগবে; সেটি দেশেই সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ করতে হবে। এগুলো না করা গেলে উপকরণ আমদানি করে তারপর জুতা তৈরি করে বিক্রি করতে হবে। শিল্প জাতীয় পণ্য রফতানি করতে হলে সব কাঁচামাল দেশে পাওয়া যায় না। কোনো দেশের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। চীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রফতানিকারক দেশ। আবার দ্বিতীয় শীর্ষ আমদানিকারকও বটে। দেশটিকে বলা হয় ফ্যাক্টরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড। এর অর্থ এই নয় যে চীনে সবকিছুই আছে। দেশটিকেও আমদানি করতে হয় প্রচুর। আমদানির দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম এবং দ্বিতীয় হচ্ছে চীন। অর্থাৎ তারা রফতানিও করে এবং আমদানিও করে। সুতরাং আমদানি একটি প্রয়োজনীয় জিনিস। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন আমাদের রফতানি বাড়ানো দরকার আছে, তেমনি সেখান থেকে আমদানিও বাড়াতে হবে। আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। যত বেশি বাণিজ্য হবে, তত বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে। প্রবৃদ্ধি যত বেশি হবে, তত কর্মসংস্থান হবে। সেজন্য রফতানির সঙ্গে আমদানিও হতে হবে। এটা হচ্ছে নিয়ম।

রফতানির সঙ্গে আমদানি না বাড়লে আমাদের অর্থনীতির গতি মন্থর হয়ে যাবে। আমাদের আমদানি প্রায় ৭০-৭৫ বিলিয়ন ডলারের। রফতানি প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের। গত অর্থবছরে আমাদের আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ শতাংশ। এটা ভালো। আবার রফতানির প্রবৃদ্ধি ৯-১০ শতাংশ হলে ভালো। কিন্তু আমদানির প্রবৃদ্ধি ও রফতানির প্রবৃদ্ধি সমান হওয়ার দরকার নেই। তাহলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাবে।

আমদানির ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য একটি ভালো সংকেত। আমাদের অর্থনীতি এখন আবার প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে। কারণ সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটা স্থিতিশীলতা এসেছে।

পাল্টা শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ছাড় দিতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রধান ব্যবসায়িক অংশীদার চীন, জাপান, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ ইউনিয়নের সঙ্গে জটিলতা বাড়ার কোনো আশঙ্কা আছে কি? এর জন্য আমাদের প্রস্তুতি কেমন বা আমরা কী করতে পারি?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে। সেই ব্যবস্থা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মের মধ্যেই আছে। এ সুযোগ নিয়ে আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে। আমি মনে করি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে অবশ্যই একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা উচিত। এতে আমাদের খুব ক্ষতি হবে না বরং লাভ হবে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য হলো যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যও বড় রফতানি বাজার। এদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে পারলে খুবই ভালো। কিন্তু এদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে অনেক সময় লাগতে পারে। প্রায় চার বছর বা আরো বেশি সময় ধরে ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এখনো হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ানসহ আঞ্চলিক সংস্থাগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের মতো বড় দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে পারলে ভালো। যাদের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আছে, তাদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে পারলে সুবিধা বেশি। যাদের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি আছে অর্থাৎ চীন ও ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করলে আমাদের রাজস্ব আহরণে ক্ষতি হবে। কারণ শুল্ক কাঠামোর একটি বাধা থাকে।

মুক্ত বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশ আসিয়ানে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। যদিও সম্প্রতি মাহাথির মোহাম্মদ বলেছেন, আসিয়ানে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে আসিয়ান প্লাস হলে বাংলাদেশের সম্ভাবনা আছে। আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো কী?

শুধু আসিয়ান না, এশিয়া-প্যাসিফিকে ইস্ট এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চীন ও কোরিয়া হচ্ছে ভবিষ্যৎ বাজার। এরই মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ জিডিপি এশিয়ায় চলে এসেছে। চীন, জাপান ও ভারত বিশ্বের শীর্ষ ১০ অর্থনীতির মধ্যে উঠে এসেছে। গত ৫০ বছরে ধরে ইউরোপ ও আমেরিকা ছিল বড় বাজার। আগামী ৫০ বছরে এশিয়া হয়ে যাবে বড় বাজার। এখানে আমাদের রফতানি বাড়াতে হবে। সম্প্রতি দেখা গেছে, অপ্রথাগত যেসব বাজার আছে, সেখানে আমাদের রফতানি বেশ বেড়েছে। এর দিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের শুল্ক কাঠামো সহজ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো রফতানির সঙ্গে শুল্কের কি সম্পর্ক? সম্পর্ক আছে। কারণ এ শুল্ক দিয়ে দেশীয় বাজারকে খুব লাভবান করে রাখা হয় বা মুনাফার হার বাড়ানো হয়, তাহলে দেশীয় উদ্যোক্তরা পণ্য রফতানি না করে দেশের বাজারে বিক্রি করতে চাইবেন। আরেকটা দিক চিন্তা করি, সেটি হলো দেশীয় বাজার বড় হচ্ছে, মানুষের আয় বাড়ছে—এটা আসছে কোথা থেকে? আসছে রফতানি থেকে। আমরা তৈরি পোশাক রফতানি করে ৪৮ বিলিয়ন ডলার আয় করছি। নন-গার্মেন্ট পণ্য থেকেও আয় করছি। আর ৩০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসছে। দুটি মিলিয়ে আমাদের প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের ফরেন এক্সচেঞ্জ। এখান থেকে আমাদের আয় বাড়ছে। এ আয় থেকেই দেশীয় বাজার বাড়ছে। বাজারের চাহিদা বাড়ছে। তাই রফতানি না করলে আমাদের দেশীয় বাজার বেশি আয় করতে পারে না। বিজ্ঞ লোকেরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রবৃদ্ধি ৭-১০ শতাংশ হতে পারে, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি বাড়ানো হয়। রফতানি বৃদ্ধি করে বাংলাদেশ দ্রুত উন্নতি করতে পারবে। সেজন্য আমাদের বাণিজ্য নীতিকে আরো সহজ ও উন্মুক্ত করা উচিত। বাণিজ্য উদারীকরণকে আমরা কৌশল হিসেবে নেই, তাতে আমাদের জন্য ভালো।

আমরা দেখেছি, বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কিছু প্রেসক্রিপশন দিলে তারপর আমাদের কিছু সংস্কার হয়। গত দেড় বছরে আমরা অনেকগুলো সংস্কার করলাম। এখন ইউএসটিআরের চাপে পড়ে করছি। নব্বইয়ের দশকে দশকে যে উদারীকরণের শুরু হলো সেটির ধারাবাহিকতা থাকল না কেন?

এর একটা বড় কারণ হচ্ছে আমাদের দেশীয় বাজারের উদ্যোক্তাদের লবিং পাওয়ার খুব বেশি। তাদের সঙ্গে এনবিআরের আঁতাত করেই আমাদের অর্থনীতিকে স্থবির করে রাখা হয়েছে। ইউএসটিআর এখন যেসব কথা বলছে, আমরা সেটি ১৫-২০ বছর ধরে বলছি। বাণিজ্য নীতি উদারীকরণ করা দরকার। যেসব শুল্ক-অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা আছে সেগুলো দূর করে সহজ করা দরকার। এনবিআর একটি প্রতিষ্ঠান। তারা কোনো কথা মানছে না। তারা বলছে, তাদের রাজস্ব আয় করতে হবে। রাজস্ব আয় করে কোথা থেকে? ওই আমদানির ওপর থেকে। সেখানে রাজস্ব আয় করা সহজ। বেশি কিছু করতে হয় না। দেশীয় বাজারে যে আয়কর আছে সেগুলোকেও সংস্কার করতে হবে। বর্তমানে যারা আয়কর দেয়, তাদেরকেই বেশি চাপে রাখা হয়। এটা কোনো নিয়ম না। এনবিআরের মৌলিক কিছু বিষয় সংস্কার করা দরকার। এ সংস্কার করা গেলে আমাদের বাণিজ্য আরো বাড়বে এবং আরো উদারীকরণ করা যাবে। বাণিজ্য উদারীকরণের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান বাড়বে। বাণিজ্য উদারীকরণের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সংযোগ রয়েছে। ইউএসটিআরের কথা শুনে যদি বাণিজ্য নীতিতে পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে এগুলো সবই হতে পারে। দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে করা যায়, তাহলে আরো ভালো হয়। আসিয়ানের সঙ্গে করা গেলে আরো বেশি ভালো।

লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় রফতানি বাজারের কোনো সম্ভাবনা আছে?

আছে। আমাদের রফতানি বাজারে বৈচিত্র্যায়ন আনতে পারি। আমি আগেই বলেছি, গত ৫০ বছর উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ ছিল বিশ্বের বড় রফতানি বাজার। আগামী ৫০ বছর এশিয়া অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়া মিলে একটা বড় রফতানি বাজার হবে। লাতিন আমেরিকারও সম্ভাবনা আছে। মহাদেশ হিসেবে আফ্রিকা সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল বাজার। ভবিষ্যৎ এখন পূর্বমুখী। এখানের আমাদের ভবিষ্যৎ আছে। এখানে আমরা প্রতিযোগিতা করে সফল হতে পারি।

Dr. Zaidi Sattar

Dr. Zaidi Sattar

Dr. Sattar is the Chairman of Policy Research Institute of Bangladesh (PRI) since its founding in 2009. PRI is a leading think tank in Bangladesh. Dr. Sattar began his career in 1969 as member of the elite Civil Service of Pakistan (CSP), and later worked in the Districts and Secretariat ...

gog